সমাপ্তি ভাষণ: বাৎসরিক ইজতেমা মজলিসে খোদ্দামুল আহ্‌মদীয়া যুক্তরাজ্য – ২০২২

হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.), খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস

১১-সেপ্টেম্বর, ২০২২

আহমদীয়া মুসলিম যুবসমাজ – নৈতিক ও আধ্যাত্মিক এক বিপ্লবের কাণ্ডারী
মজলিস খোদ্দামুল আহমদীয়া যুক্তরাজ্যের বার্ষিক ইজতেমা ২০২২ উপলক্ষে পঞ্চম খলীফাতুল মসীহ্‌
হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.)-এর ভাষণ

১১ সেপ্টেম্বর ২০২২, এক ঈমানোদ্দীপক ভাষণের মধ্য দিয়ে মজলিস খোদ্দামুল আহমদীয়া (আহমদীয়া মুসলিম পুরুষ যুব অঙ্গ-সংগঠন) যুক্তরাজ্যের জাতীয় ইজতেমা (বার্ষিক সম্মেলন) সমাপ্ত করেন আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের বিশ্ব-প্রধান ও পঞ্চম খলীফাতুল মসীহ্ হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.)। কিংস্‌লি-র ওল্ড পার্ক ফার্মে অনুষ্ঠিত তিন দিনের এ আয়োজনে ৫৭০০ এর অধিক যুবক ও বালক যোগদান করেন। এ উপলক্ষ্যে হুযূর আকদাস প্রদত্ত বক্তৃতার বঙ্গানুবাদ নিম্নে উপস্থাপন করা হলো।
তাশাহুদ, তাআব্বুয ও বিসমিল্লাহ্‌ পাঠের হযরত খলীফাতুল মসীহ্‌ আল-খামেস (আই.) বলেন:
আল্লাহ্‌র ফযলে এই সপ্তাহান্তে মজলিস খোদ্দামুল আহমদীয়া যুক্তরাজ্য কোভিড-১৯ বিশ্বজনীন মহামারীর সূচনার পর থেকে এই প্রথমবারের মতো তাদের জাতীয় ইজতেমা বৃহৎ পরিসরে আয়োজন করতে পেরেছে।
ইজতেমার কর্মসূচিতে মজলিস খোদ্দামুল আহমদীয়া প্রাথমিকভাবে খেলাধুলার এক পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করেছিল। কিন্তু, মহামান্য রানী এলিজাবেথ-এর মৃত্যুতে আমি সদর সাহেবকে নির্দেশনা প্রদান করি, যেন তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের চিহ্নস্বরূপ খেলাধুলার কর্মসূচি গুটিয়ে নেওয়া হয়। আমি একে এই জন্য আবশ্যকীয় মনে করি যে, রানী দীর্ঘকাল আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন এবং তিনি সত্তর বছরেরও বেশি সময় ধরে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণভাবে ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে এ দেশের নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। তাঁর শাসনামলে যুক্তরাজ্য বিশ্বে ধর্মীয় স্বাধীনতার এক আলোকবর্তিকা হিসেবে বিদ্যমান থেকেছে। প্রকৃতপক্ষে, রানী নিজেই অনেক উপলক্ষে সত্যিকারের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির পক্ষে কথা বলেছেন। সুতরাং, আমরা এমন একজন সদয় রানীর অধীনে বসবাস করতে পেরে কৃতজ্ঞ। আহমদী মুসলমান হিসেবে আমাদের বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত যে, চতুর্থ খলীফাতুল মসীহ্ (রাহে.)-এর যুক্তরাজ্যে হিজরতের পর রানী এলিজাবেথের শাসনামলে (এই দেশে) আমাদের জামা’তের আন্তর্জাতিক সদর দপ্তর (মরকয) প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীনভাবে আমাদের ধর্ম পালন ও প্রচারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ দিক থেকে, আমরা সর্বদা রানী এলিজাবেথ, ব্রিটিশ সরকার ও এই দেশের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো।
এছাড়া, আমরা দোয়া করি যেন আমাদের নতুন রাষ্ট্রপ্রধান, রাজা ৩য় চার্লস, সকল মানুষের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করার ধারা এ জাতির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে বজায় রাখেন; আর, এখানে মানুষের অধিকার যেন সর্বদা নিশ্চিত করা হয়।
যাহোক, আমি আশা রাখি ও দোয়া করি যে, সকল অংশগ্রহণকারী ইজতেমায় যেসকল শিক্ষামূলক এবং অন্যান্য কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে সেগুলো থেকে অশেষ কল্যাণমণ্ডিত হয়ে থাকবেন।
আজকের এই সমাপনী অধিবেশনে, আমি মজলিস খোদ্দামুল আহমদীয়ার সদস্যদের কিছু মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের উল্লেখ করতে চাই। সবকিছুর উপরে, আপনাদের কখনোই সেই প্রকৃত উদ্দেশ্য, অর্থাৎ, আল্লাহ্‌ তা’লার ইবাদতকে ভুলে গেলে চলবে না, যার জন্য তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন। আর, এক্ষেত্রে ইবাদতের প্রাথমিক রূপ হলো প্রতিদিন পাঁচ বেলার ইবাদত, অর্থাৎ, সালাত বা নামায। যারাই নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করে থাকেন, তাদের অবশ্যই নিজ নিজ ইবাদতের সুরক্ষার দিকে বিশেষ মনযোগ নিবদ্ধ করতে হবে — যা এই দাবি করে যে, তারা যেন সর্বোচ্চ নিষ্ঠার সঙ্গে নামায আদায়ের ক্ষেত্রে নিয়মিত এবং সময়নিষ্ঠ হন। আল্লাহ্ তা’লা এজন্যই নামাযকে আবশ্যকীয় করেছেন যে, এটি ছাড়া একজন মানুষ আধ্যাত্মিকভাবে জীবিত থাকতে পারে না। অপর কথায়, সালাত অত্যাবশ্যকীয় এবং একজন ব্যক্তির ঈমান এবং আধ্যাত্মিকতা এটি ছাড়া টিকে থাকতে পারে না।
আল্লাহ্‌র ফযলে, অনেক তরুণ আহমদী নামায আদায়ের বিষয়ে যথেষ্ট যত্নশীল এবং আল্লাহ্‌ তা’লার সাথে তারা একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। আমি অনেক তরুণ আহমদীর মধ্যে এমন এক প্রেরণা লক্ষ করেছি, অথবা আমার কাছে লেখা তাদের চিঠিতে বিষয়টি প্রতিভাত হয়েছে। তবুও, আল্লাহ্‌ তা’লার ইবাদতের বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের কখনোই নিজেদের ইবাদতের মানকে নিচের দিকে পিছলে যেতে দেওয়া যাবে না। আমাদেরকে সর্বদা আমাদের স্রষ্টার সাথে নিজেদের সম্পর্ককে উন্নত ও শক্তিশালী করার জন্য চেষ্টা করে যেতে হবে। যেভাবে আমাদের পার্থিব শরীরের জন্য খাদ্য ও বাতাস প্রয়োজন, ঠিক সেইভাবে আমাদের আত্মার জন্যও অব্যাহতভাবে আধ্যাত্মিক পুষ্টির প্রয়োজন।
অনেক সময় মানুষ যখন সমস্যার মুখোমুখি হয়, অথবা তাদের কোনো কিছুর প্রয়োজন থাকে তখন তারা আল্লাহ্‌ তা’লার সামনে অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ হয়ে বিনয়ের সাথে মাথা নত করে; কিন্তু যেই মুহূর্তে তাদের সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, তাদের আধ্যাত্মিকতার তীব্রতা দ্রুত হারিয়ে যায় এবং তারা অলস হয়ে পড়ে এবং নামাযে নিজেদের মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। আবহাওয়ার মতই তাদের আধ্যাত্মিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে; কখনো তা উষ্ণ থাকে, কখনো শীতল হয়ে যায়, কখনো বায়ু এক দিকে প্রবাহিত হয়, কখনো আরেকদিকে। কখনো কিছুদিন উষ্ণ আবহাওয়ার পর এক পশলা বৃষ্টি বা শীতল বায়ু প্রবাহ এসে সাময়িক স্বস্তি ও আনন্দ দান করে, কিন্তু স্থায়ী প্রশান্তি এতে থাকে না। তাই, কারো জন্য যেমন বায়ু, খাবার এবং পানির চাহিদা চিরন্তন, একইভাবে যদি কেউ আধ্যাত্মিকভাবে জীবিত থাকতে চান, তাকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, তিনি যেন প্রতিনিয়ত সালাত আদায়ের মাধ্যমে তার আত্মার পুষ্টি সাধন করেন। অতএব, সারা জীবনে নামায আপনার এমন এক সঙ্গী হওয়া উচিত যাকে আপনি কখনোই পরিত্যাগ করবেন না।
উপরন্তু, মুসলমানদের আল্লাহ্‌ তা’লা আদেশ প্রদান করেছেন তারা যেন তাদের নামায বাজামাত আদায়ের জন্য সমবেত হয়। গত কয়েক বছর, কোভিডের কারণে, আমাদের মসজিদগুলো বন্ধ ছিল, বা এতে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত ছিল এবং জামা’তের সদস্যদের এই নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন নিজ গৃহে বাজামাত নামায আদায় করেন। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে, পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং আমরা আবারও আমাদের জলসা, ইজতেমা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করতে পারছি। সরকারি বিধি-নিষেধ সমাপ্ত হয়েছে এবং দৈনন্দিন পার্থিব কাজকর্মের সঙ্গে যতদূর সম্পর্ক, মানুষ এখন অনেকটাই তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছে। একই সাথে, নিজ গৃহে নামায পড়ার অভ্যাস হয়ে যাওয়াতে, মসজিদ বা সালাত সেন্টারে না এসে কিছু মানুষ এখনো তা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অনুধাবন করা উচিত যে, নিজ গৃহে নামায পড়া বিশ্বজনীন মহামারীর চরম অবস্থায় একটি সাময়িক সমাধান ছিল, যেভাবে কোন অসুস্থ ব্যক্তিকে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য (কৃত্রিমভাবে) অক্সিজেন দেওয়া হয়ে থাকে। এখন যেহেতু পরিস্থিতির, আলহামদুলিল্লাহ, অনেকখানি উন্নতি হয়েছে, এখন আল্লাহ্ তা’লার নির্দেশ অনুযায়ী আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভের জন্য যথাযথ পদ্ধতিতে ফিরে আসা আবশ্যক, যার মধ্যে মুসলমান পুরুষদের জন্য তাদের স্থানীয় মসজিদ বা সালাত সেন্টারে যথাসম্ভব সশরীরে উপস্থিত হয়ে নিয়মিত বাজামাত নামায আদায় করার দাবি রয়েছে।

সর্বদা স্মরণ রাখবেন যে, কোন ব্যক্তির নৈতিকতার সঙ্গে জীবন যাপনের জন্য নামায হলো মৌলিক উপাদান। এটি মানুষকে অনৈতিক আচরণ এবং পাপ থেকে রক্ষা করে এবং তাদেরকে সৎকর্ম এবং পুণ্যের দিকে ধাবিত করে। আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূর্ণ করা এবং আল্লাহ্‌ তা’লার অনুগ্রহ এবং পুরস্কার লাভের এটি সর্বপ্রধান মাধ্যম। নতুবা, নামায এবং ইবাদত ব্যতিরেকে, সৎপথে পরিচালিত একটি জামা’তের সদস্য হওয়ার, বা যুগ-ইমামকে মানার এবং ঈমানে দৃঢ় হওয়ার আমাদের দাবি অর্থহীন এবং অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে।
যেভাবে আমি বলেছি, মূলত নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র ইবাদত আমাদেরকে কল্যাণের দিকে আকৃষ্ট করে এবং আল্লাহ্‌ তা’লা ও তাঁর সৃষ্টির অধিকার পূরণের বিষয়ে আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে। এটি আল্লাহ্‌ তা’লার এক মহান অনুগ্রহ যে তিনি আমাদের জামা’তকে সকল বয়সের অনেক নিবেদিতপ্রাণ মানুষে সমৃদ্ধ করেছেন, যারা সর্বদা যে কোন দায়িত্ব পালন, সহযোগিতা বা কুরবানী করার জন্য প্রস্তুত। যখনই তাদেরকে আহ্বান করা হয়, তারা সাথে সাথে উত্তর দেন, “আমরা এসে গেছি এবং প্রস্তুত আছি, লাব্বাইক” এবং নিজেদেরকে তাদের দ্বীনের খাতিরে যে কুরবানী বা সেবার প্রয়োজন তার জন্য পেশ করে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ, অতিসম্প্রতি, হাজার হাজার আহমদী নারী-পুরুষ এবং শিশু নিজেদেরকে যুক্তরাজ্য জলসার ডিউটির জন্য পেশ করেছেন, এবং জামা’তের খাতিরে নিজেদের দৈনন্দিন কাজ এবং কর্মব্যস্ততাকে স্থগিত রেখেছেন; আর এই বিষয়টি কিছুটা এই ইজতেমার প্রস্তুতির সময়ও ঘটেছে। অনেকেই বেশ কিছুদিন, বা এমনকি কয়েক সপ্তাহ, ঠিকমতো ঘুমান নি; কিন্তু, একটি বারের জন্যও নিজেদের দায়িত্বের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করেন নি অথবা কোন প্রকার বিরক্তি বা ক্লান্তির অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন নি।
অনুরূপভাবে, আল্লাহ্‌র পথে আর্থিক কুরবানির ক্ষেত্রে, বিশ্বজুড়ে অগণিত আহমদী রয়েছেন যারা যখনই কোন স্কীম চালু করা হয় তখন তাতে হৃদয় উজার করে অংশগ্রহণ করে থাকেন এবং ইসলামের প্রচারে নিজেদের ভূমিকা পালনে বড় বড় কুরবানি করে থাকেন। একই সাথে, এটি মনে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, সাময়িক আত্মত্যাগ করা বা কয়েক দিনের জন্য সৎকর্মপরায়ণ জীবনযাপন করা যথেষ্ট নয়; বরং, আল্লাহ্‌ তা’লা তাঁর অনুসারীদের মাঝে খোদাভীরুতার এক স্থায়ী অবস্থা কামনা করেন, এবং যেভাবে আমি ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি, এই অবস্থা অর্জনের মধ্যে নামাযের মৌলিক ভূমিকা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে, আল্লাহ্‌ তা’লা পবিত্র কুরআনে বলেন:

اَقِمِ الصَّلٰوۃَ ؕ اِنَّ الصَّلٰوۃَ تَنۡھٰی عَنِ الۡفَحۡشَآءِ وَالۡمُنۡکَرِ ؕ وَلَذِکۡرُ اللّٰہِ اَکۡبَرُ

“নামায কায়েম করো। নিশ্চয় নামায মানুষকে মন্দ কাজ ও অশ্লীলতা থেকে দূরে রাখে এবং আল্লাহ্ তা’লার স্মরণই সবচেয়ে বড় (পুণ্য)।”

এই আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা মুসলমানদেরকে ‘নামায় কায়েম’ করতে আদেশ প্রদান করছেন এবং ঘোষণা করছেন যে, নামায অনৈতিকতা, অশ্লীলতা এবং তাঁর অপছন্দীয় সকল কাজ থেকে একজন ব্যক্তিকে রক্ষা করার উপায়। অতএব, নৈতিক জীবনযাপন এবং পাপ থেকে মুক্তির জন্য আমাদের অবশ্যই পাঁচ ওয়াক্ত নামায নির্ধারিত সময়ে পূর্ণ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে আদায় করতে হবে। ‘আকিমিস সালাত’ বা ‘নামায কায়েম’ করার অর্থ হল নামাযে নিয়মিত হওয়া, পূর্ণ মনযোগের সঙ্গে এবং আল্লাহ্ তা’লার নিকট নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের অবস্থায় এটি আদায় করা।
এই যুগে, বহু প্রকারের পাপ সমাজে ছেয়ে আছে। প্রতিটি কোণে আর প্রতিটি মোড়ে পাপে প্রলুব্ধকারী উপকরণ বিদ্যমান, যা সমাজকে কলুষিত করে সমাজের কাঠামোকে বিনষ্ট করতে চায়। বিশেষ করে, একটি বড় পাপ, যা সম্পর্কে আমি আপনাদের সকলকে সাবধান করতে চাই, তা হল মিথ্যাবাদিতা। সমাজের সকল স্তরে মিথ্যাবাদিতা ছেয়ে আছে, এমন পর্যায়ে যে, অনেক মানুষ তাদের পার্থিব উদ্দেশ্য বা স্বার্থ লাভ করার জন্য চিন্তাভাবনা না করে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকে আর মনে করে যে, তাদের এই সকল অসত্য কথা অত্যন্ত নগণ্য। অথচ, আল্লাহ্‌ তা’লা এবং মহানবী (সা.) মিথ্যাচারকে এক অতীব গুরুতর পাপ বলে গণ্য করেছেন, যা ব্যক্তি ‍ও বিস্তৃত সমাজ উভয়েরই জন্যই ক্ষতিকর।
বস্তুত, একটি হাদিসে বর্ণিত আছে যে, মহানবী (সা.) বর্ণনা করেছেন যে, চারটি অভ্যাস ও লক্ষণ একজনকে মুনাফিক হিসেবে চিহ্নিত করে। আর মহানবী (সা.)-এর ভাষ্যমতে একজন মুনাফিকের চিহ্নিতকারী লক্ষণসমূহের মধ্যে প্রথম এবং প্রধান হল প্রতারণা এবং মিথ্যাচার। উদাহরণস্বরূপ, যখন কেউ নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য মিথ্যা বলে বা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে থাকে। হাদিসটির ভাষ্যমতে, একজন মুনাফিককে চিহ্নিতকারী লক্ষণসমূহের মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি হলো চুক্তি বা অঙ্গীকার ভঙ্গ করা এবং তার ওপর ন্যস্ত আমানতের খেয়ানত করা। আজকের পৃথিবীতে সমাজের সকল স্তরে চুক্তি ও অঙ্গীকার বিদ্যমান তা কারো ব্যক্তিগত বিষয় হোক, অথবা পেশাদারী বা ব্যবসায়িক লেনদেন সংক্রান্ত। দুঃখের বিষয় হলো, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, ঘোষণা বা চুক্তি করার পর তা থেকে পিছিয়ে আসা অবিশ্বাস্য রকমের মামুলী বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার কত বড় তা অপ্রাসঙ্গিক। কোন অঙ্গীকার খুব ছোট বা ক্ষুদ্র পরিসরের হলেও, সেই ব্যক্তির দায়িত্ব হলো প্রতিশ্রুতি শর্ত অনুসারে তা পূর্ণ করা। অন্যথায়, হাদীস অনুসারে সে মুনাফিকের অন্তর্ভুক্ত হবে।
সেই হাদিস অনুসারে একজন মুনাফিকের চতুর্থ বৈশিষ্ট্য এই যে, যখন সে যুক্তি উপস্থাপন বা বিতর্ক করে তখন সে অশ্লীল ও নোংরা ভাষা ব্যবহার করে। এর বিপরীতে, একজন মুমিনের সর্বদা শালীনতা ও ভদ্রতার সর্বোচ্চ মান বজায় রাখা উচিত, আর কখনোই উত্তম নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত হওয়া উচিত নয়। সুতরাং, একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, আমরা সকল প্রকার মুনাফেকি (কপটতা) থেকে মুক্ত এবং আমাদের কথা এক দৃঢ় অঙ্গীকারের ন্যায়।
কখনো ভুলে যাবেন না যে, আমরা সেই যুগ ইমাম, হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আ.)-কে মান্য করার দাবি করি, যিনি মহানবী (সা.)-এর সবচেয়ে নিষ্ঠাবান সেবক এবং অনুসারী ছিলেন এবং এর সূত্র ধরে, আমরা অঙ্গীকার করি যে, আমরা তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবো যারা সর্বদা নিজেদের ধর্মবিশ্বাসকে সমুদয় পার্থিব বিষয়াদির ওপর প্রাধান্য দেয়।

এই তো কিছুক্ষণ আগে, আপনারা সবাই দাঁড়িয়ে গুরুগম্ভীর পরিবেশে এই অঙ্গীকার করলেন যে, আপনারা আপনাদের ধর্ম বিশ্বাসকে অন্য সকল কিছুর উপর প্রাধান্য দান করবেন। এটি এমন একটি অঙ্গীকার যা আমরা আমাদের অনুষ্ঠানসমূহে প্রায়ই করে থাকি; কিন্তু, মুখের বুলি অর্থহীন যতক্ষণ না এবং যদি তাকে যথার্থতা দানকারী আচরণ দ্বারা তা সমর্থিত না হয়।
আপনারা ভাবতে পারেন ধর্মকে সমুদয় পার্থিব বিষয়ের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার অর্থ কী। সহজ কথায়, এর অর্থ এই যে, যখন নামাযের সময় হয় তখন কেউ যেন অন্য যা কিছু করছে আল্লাহ্‌র ইবাদতের খাতিরে তা থেকে বিরত হয়। সুতরাং, ঐসকল ব্যতিক্রমধর্মী পরিস্থিতি ছাড়া যেখানে আল্লাহ্ নামায জমা (দুই ওয়াক্তের নামায একত্রে আদায়) করার অথবা পরবর্তীতে পড়ার অনুমতি দিয়েছেন, প্রত্যেক খাদেমের উচিত তাদের নামায সময়মত পড়া, এবং যেখানেই সুযোগ থাকে তা বা-জামাত আদায় করা। অনুরূপভাবে, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন আপনাদের কখনোই মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়। আপনারা কখনোই আপনাদের কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করবেন না; আর অন্যদের সঙ্গে আচরণে মন্দ ভাষা ব্যবহার করবেন না, যথাযথ শিষ্টাচার থেকে বিচ্যুত হবেন না। এইগুলো সেই সকল আবশ্যকীয় উপকরণ ও বৈশিষ্ট্য যা সৎকর্মপরায়ণ মানুষের এক সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সহিষ্ণু সমাজ গঠনে যার মৌলিক ভূমিকা রয়েছে। যদি আপনারা এভাবে জীবনযাপন করেন, আপনারা তাদের অন্তর্ভুক্ত হবেন যারা আল্লাহ্ তা’লার সাথে নিজ ইবাদতের মাধ্যমের এক প্রকৃত ও স্থায়ী বন্ধন গড়ে তোলার পাশাপাশি, সমাজে সত্যকে বিস্তার দানকারী এবং মানবতার জন্য আলোর এক উৎসে পরিণত হবেন।
সত্যবাদিতার সাথে আচরণ করা প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, অনেক খোদ্দাম এখন পেশাদার জীবনে প্রবেশ করেছেন অথবা ব্যবসায় নিয়োজিত হয়েছেন; আর তাই তাদের নিশ্চিত করা উচিত যে, তারা যেন তাদের ব্যবসায় বা কর্মস্থলে কখনও সামান্যতম প্রতারণার আশ্রয়ও না নেয়। উদাহরণস্বরূপ, যখন ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করার সময় আসে, তখন তাদের সততার সাথে নিজেদের আয় ঘোষণা করা উচিত এবং সরকারের যা প্রাপ্য তা পরিশোধ করা উচিত। অনুরূপভাবে, যা কিছু অফিশিয়াল কাগজপত্র তাদের ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক কারণে প্রয়োজন হয় সেগুলো সততার সাথে অর্জন করা উচিত এবং সেখানে প্রদত্ত সকল ঘোষণা একেবারেই নির্ভেজাল এবং সত্য হওয়া উচিত। অনুরূপভাবে, একজন খাদেমের কখনোই তার চাঁদার বিষয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়। যদি কারো পক্ষে নির্ধারিত হারে চাঁদা প্রদান করা সম্ভব না হয়, তাহলে তিনি কম হারে চাঁদা দেওয়ার অনুমতি নিতে পারেন। কিন্তু তার নিজের আর্থিক অবস্থা (বা আয়) সম্পর্কে তার কখনোই মিথ্যা বলা উচিত নয়; কেননা, অসততার পথ ধরে কখনোই আল্লাহ্‌ তা’লার আশিস লাভ করা সম্ভব নয়।
আরেকটি বিষয়, যা আমি বিশেষ করে অল্পবয়স্ক খোদ্দাম বা আতফাল, যারা এখনো স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করছে, তাদের জন্য উল্লেখ করতে চাই, তা এই যে, তাদেরকে তাদের সঙ্গ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। আপনাদের বয়সে, আপনাদের বন্ধুগণ এবং আপনারা যাদের সঙ্গে সময় কাটান তারা সহজেই আপনাকে প্রভাবিত করতে পারে। যেভাবে পর্যবেক্ষণ দ্বারা সাব্যস্ত হয়, যদি আপনার সঙ্গ মন্দ হয়, তাহলে আপনি সত্য অবলম্বন ও দয়া প্রদর্শনের পরিবর্তে তাদের কাছ থেকে মন্দ অভ্যাস রপ্ত করবেন। যেমন, মিথ্যা কথা বলা, অযথা ঝগড়া করা, এমনকি মারামারি করা। সুতরাং, কম বয়সী খোদ্দাম ও আতফালদের অবশ্যই তাদের সঙ্গ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করুন যারা আন্তরিক, সৎ এবং অনৈতিক বা বিবেকহীন কাজে জড়িত নয়। উপরন্তু, আপনার বয়স বাড়ার এবং আরো বেশি স্বাধীনতা লাভের সাথে সাথে, নিজের সতর্কতা বিসর্জন দেওয়া যাবে না। নিজেদের ধর্মবিশ্বাসে দৃঢ় থাকুন, এবং নিশ্চিত করুন যে, আপনি অন্য কারো সাথে লড়াই করেন না, কাউকে গালি-গালাজ করেন না, আর কারো সাথে নোংরা ভাষা ব্যবহার করেন না, বা এমনভাবে কথা বলেন না যা অন্যকে প্ররোচিত করে। বয়োজ্যেষ্ঠ খোদ্দামদেরও এ বিষয়গুলোতে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। অন্যথায়, হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আ.)-কে মান্য করা এবং তাঁর শিক্ষার অনুসরণের দাবি করা সত্ত্বেও তিনি যে মতাদর্শ ধারণ করেছেন এবং যে শিক্ষা দিয়েছেন আপনি তার লঙ্ঘনকারী হবেন।
স্মরণ রাখবেন, মসীহ্‌ মওউদ (আ.) যা কিছু শিখিয়েছেন তা পবিত্র কুরআন এবং মহানবী (সা.)-এর শিক্ষার অনুসরণে। মসীহ মওউদ (আ.) মিথ্যা ও প্রতারণাকে এক গুরুতর পাপ হিসেবে ঘোষণা করেছেন যা অন্যান্য অনেক পাপের মূল হিসেবে কাজ করে এবং যা থেকে বহু প্রকারের পাপ ও নৈতিক স্খলনের উৎপত্তি হয়ে থাকে।
মিথ্যাবাদিতা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে, মসীহ্‌ মওউদ (আ.) বলেছেন, “বাস্তবে যতক্ষণ না কেউ মিথ্যাকে পরিত্যাগ করে, তার পক্ষে পবিত্র হওয়া সম্ভব নয়। পার্থিবতায় নিমগ্ন নাদান মানুষ মনে করে যে, মিথ্যা ছাড়া দুনিয়াতে তাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়; অথচ, এটি একেবারেই ভ্রান্ত একটি কথা।” মসীহ্‌ মওউদ (আ.) আরও বলেন, “যদি কেউ সত্যবাদিতার পথে দুনিয়ায় টিকে থাকতে না পারে, তবে নিশ্চিতভাবে মিথ্যাবাদিতাও তাকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না।” মসীহ্‌ মওউদ (আ.) এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, “এটি বড় পরিতাপের বিষয় যে, এই সকল দুষ্ট লোকেরা আল্লাহ্ তা’লাকে তাঁর প্রকৃত মর্যাদা প্রদান করে না। তারা জানে না আল্লাহ্ তা’লার দয়া ও অনুগ্রহ ব্যতীত কেউ বেঁচে থাকতে পারে না। তবুও তারা তাদের মিথ্যার নোংরামীকে তাদের খোদা এবং তাদের সমস্যা দূরীকরণের মাধ্যম মনে করে।” তিনি বলেন, “একান্তই এই কারণে খোদা তা’লা মিথ্যাকে প্রতিমার অপবিত্রতার সাথে সম্পর্কযুক্ত করে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন।” মসীহ্‌ মওউদ (আ.) বলেন যে, যেখানে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিমা পূজার প্রতি তাঁর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন, তিনি মিথ্যাবাদিতার প্রতি এক ঘৃণা ও বিরাগ প্রকাশ করেছেন এবং এদুটোকে একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বলে ঘোষণা করেছেন। মসীহ্ মওউদ (আ.) আরও বলেন যে, “নিশ্চিতভাবে জেনে রাখুন, আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ ছাড়া আমরা এক পা-ও চলতে পারি না, এমনকি একটা শ্বাসও নিতে পারি না।” যদি আমরা আল্লাহ্‌র সাহায্য ও অনুগ্রহ ছাড়া এমনকি একবার শ্বাসও নিতে না পারি, তাহলে কোন বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষ কেন মিথ্যার ওপর নির্ভর করবে?
তাই, আজ, এটি আহমদী মুসলমান যুবকদের দায়িত্ব যে, সকল ধরনের মিথ্যা ও প্রতারণার বিরুদ্ধে এক অভিযান ও আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করা। আর তাদেরকে অবশ্যই নিজ দৃষ্টান্ত উপস্থাপনের মাধ্যমে এই নেতৃত্ব প্রদান করতে হবে। প্রত্যেক খাদেম ও তিফলের উচিত অঙ্গীকার করা যে, তারা কখনো মিথ্যা কথা বলবে না। কারণ, মিথ্যা শির্‌কের বা আল্লাহ্ তা’লার সাথে অংশীবাদিতার সমতুল্য। একদিকে আমরা গর্বের সাথে দাবি করি যে, আমরা আল্লাহ্‌ তা’লার মনোনীত সম্প্রদায় এবং জাতি এবং আমরা তাঁর নিকট নিবেদিতভাবে সেজদাবনত হই, তথাপি, অপরদিকে, আমাদেরই মাঝে এমন কিছু মানুষ আছে যারা নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য মিথ্যাবাদিতার ওপর নির্ভর করে চলে। এটি স্পষ্ট হওয়া উচিত যে, যারা মিথ্যার আশ্র‍য় নেয়, তাদের আল্লাহ্ তা’লার সাহায্য প্রত্যাশা করা উচিত নয়; কেননা, তিনি তাদের প্রার্থনা গ্রহণ করবেন না। আমি যেমনটি বলেছি, এখন প্রত্যেক খাদেম ও তিফলের অঙ্গীকার করার সময় যে, তারা কখনো মিথ্যার বশবর্তী হবে না। এখন সময় সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলনে আপনাদের নেতৃত্ব প্রদান করার এবং তাদের মাঝে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যারা আল্লাহ্ তা’লার ইবাদত সর্বোত্তম উপায়ে করে এবং যাদের নৈতিকতার মান সর্বোচ্চ পর্যায়ের।
যদি আমাদের যুব-সমাজ সকল প্রকার মিথ্যাকে পরিত্যাগ করতে পারে এবং সর্বদা সত্যবাদী হয়ে যায়, তাহলে অন্যান্য সকল উত্তম নৈতিক গুণাবলী আপনা আপনি তাদের মধ্যে সৃষ্টি হবে। উদাহরণস্বরূপ, যখন কেউ মিথ্যাকে পরিত্যাগ করে, তখন তার পক্ষে প্রতারণা করা সম্ভব নয়, তার পক্ষে অঙ্গীকার ভঙ্গ করা সম্ভব নয়, আর তার পক্ষে গালিগালাজ করা বা অশালীন ভাষা ব্যবহার করাও সম্ভব নয়। বরং তিনি সেই সকল নৈতিক গুণাবলী ধারণ করবেন যেগুলো একটি সৌহার্দ্য ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। নিশ্চিতভাবে, মিথ্যাচার এবং নিজেদের অঙ্গীকার ও চুক্তিসমূহ পূরণ করতে ব্যর্থতা আজকের সমাজে পরিব্যাপ্ত অবিচার ও বিশৃঙ্খলার গোড়ার কারণ, তা ক্ষুদ্র পরিসরে পারিবারিক পরিমণ্ডলেই হোক অথবা বৃহত্তর পরিসরে বিস্তৃত সমাজের মাঝেই হোক। সুতরাং, আপনাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে যে, আপনারা কখনো মিথ্যা কথা বলেন না কিংবা সত্য থেকে এক ইঞ্চি পরিমাণও বিচ্যুত হন না। কেবল যদি আমরা এমন নৈতিক মানে উপনীত হতে পারি যা কপটতার শৃঙ্খল থেকে আমাদেরকে মুক্ত করে, তবেই আমরা ধর্মকে জাগতিকতার উপর প্রাধান্য দেওয়ার অঙ্গীকারের দাবি পূরণ করতে পারবো। যদি পুরো আহমদী যুবসমাজ এমন উচ্চতায় উপনীত হয়, তবে তারা সমাজের মাঝে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক রূপান্তর ডেকে আনবে, আর, একজন খাদেমের কাছে হযরত মুসলেহ্‌ মওউদ (রা.)-এর প্রকৃত প্রত্যাশা পূরণ করবে, যখন তিনি গভীর প্রজ্ঞার সাথে বলেছিলেন যে, যুবকদের সংশোধন ব্যতিরেকে কোন জাতির সংশোধন হতে পারে না।
সর্বদা স্মরণ রাখবেন যে, হযরত মুসলেহ্‌ মওউদ (রা.)-এর মুখনিসৃত এই আলোকজ্জ্বল শব্দগুলো কেবল ইজতেমা এবং খোদ্দামের অন্যান্য অনুষ্ঠানে ব্যানারে প্রদর্শনের জন্য নয়। কয়েক বছর পূর্বে, আমি মজলিস খোদ্দামুল আহমদীয়াকে নির্দেশনা প্রদান করে ছিলাম যেন তারা এই স্লোগানযুক্ত ব্যাজ প্রস্তুত করে; আর এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য এই ছিল যে, সেগুলো যেন হযরত মুসলেহ্‌ মওউদ (রা.)-এর এই কালজয়ী শব্দগুলো সকলকে বার বার স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু, আমরা যতই ব্যানার বা ব্যাজ প্রস্তুত করি না কেন তা অর্থহীন, যতদিন না আমাদের যুব-সমাজ সক্রিয়ভাবে নিজেদের সংশোধনে উদ্যোগী হবে এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞার সাথে যে, তারা জাতির উন্নতিতে তাদের ভূমিকা পালন করবে। সুতরাং, প্রত্যেক খাদেম এবং প্রত্যেক তিফলকে অবশ্যই নিজেদের জাতি ও দেশের পথ প্রদর্শন করাকে তাদের ব্যক্তিগত মিশন বা ব্রত বলে গণ্য করে সেই লক্ষ্যে নিজেদের সংশোধনের জন্য সংগ্রাম করতে হবে।

তবলীগের মাধ্যমে প্রকৃত ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে প্রত্যেক আহমদীর দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। সুতরাং, আপনাদের সকলেরই, আল্লাহ্‌র সাহায্য চাওয়ার পাশাপাশি, নিজেদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মান উন্নয়নের মাধ্যমে মসীহ্‌ মওউদ (আ.)-এর মিশনের সাহায্যার্থে নিজেদের ভূমিকা পালনে সচেষ্ট হতে হবে। আপনাদের কথা ও কাজে কোন ধরনের অমিল কখনোই থাকা উচিত নয়। আপনারা যা মুখে বলেন, ব্যবহারিক জীবনে তারই অনুশীলন করুন। অন্যথায় আপনারা মিথ্যাবাদিতার দোষে দোষী হবেন, যে বিষয়টিকে মহানবী (সা.) মুনাফিকের একটি লক্ষণ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তদনুযায়ী, প্রত্যেক খাদেম, তিফল, পদাধিকারী, বরং সকল আহমদীর, অবশ্যই হযরত মুসলেহ্‌ মওউদ (রা.)-এর কথাগুলোর ওপর গুরুত্ব সহকারে মনোনিবেশ করতে হবে। আপনাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে যে, এই মূল্যবান শব্দগুলো কেবল একটি আকর্ষণীয় ও শ্রুতিমধুর স্লোগানে যেন সীমিত না থাকে, বরং সর্বদা যেন এর ওপর আমল করা হয়, এবং আমাদের আহমদী যুব-সমাজের নৈতিক অবস্থার মাঝে যেন এর প্রতিফলন থাকে। বাস্তবিক পক্ষেই, এই স্লোগান প্রত্যেক খাদেমের জন্য একটি লক্ষ্য এবং একটি চ্যালেঞ্জ পেশ করে। এমন হওয়া উচিত যে, বিশ্বকে সংশোধন করে আরও উন্নত করতে এটি আপনাদেরকে যেন অনুপ্রাণিত করে। আপনাদের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আপনাদেরকে তাকওয়ার পথে আরো অগ্রসর করে; কেননা, আপনাদের আধ্যাত্মিক অগ্রগতি এবং সংশোধনের সাথে আমাদের জামা’তের সফলতা ও অগ্রগতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
এছাড়াও সেই সকল নবীন খোদ্দাম, যারা সম্প্রতি খোদ্দামুল আহমদীয়ায় প্রবেশ করেছেন, তাদের উদ্দেশে আমি বলতে চাই যে, তাদের এমন মনে করা উচিত নয় যে, এটি কেবল বিনোদন বা আনন্দ-ফুর্তির একটি বয়স। আপনারা এমন এক বয়সে উপনীত হয়েছেন যেখানে আপনাদের চিন্তা-ভাবনা এবং আচরণ প্রতিদিন পরিপক্ক হওয়া উচিত। বেশ কিছুদিন ধরেই, আমি ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের বর্ণনা আমার জুমুআর খুতবায় প্রদান করে আসছি, যেখানে আমি সেই যুগের অনেক তরুণ-বালকের ঘটনা বর্ণনা করেছি, যারা আপনাদের চেয়ে বয়সে বেশি নয়; কিন্তু, যারা ইসলামের খাতিরে অসাধারণ আত্মত্যাগ পেশ করতে সমর্থ হয়েছিলেন এবং অসাধারণ সফলতাসমূহ লাভ করেছিলেন। এসবই এই কারণে যে, তারা তাদের উদ্দেশ্য এবং তাদের সামনের চ্যালেঞ্জকে অনুধাবন করেছিলেন। তারা অনুধাবন করেছিলেন যে, এটি তাদের দায়িত্ব, যেন আল্লাহ্‌র ইবাদতের মধ্য দিয়ে এবং সকল সময়ে নৈতিকতার সর্বোচ্চ মান প্রদর্শন করে তাদের জীবনের উদ্দেশ্য তারা পূরণ করেন। নবীন মুসলমান হিসেবে তাদের মূল্য এবং মর্যাদা তারা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তারা তাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং এটি নিশ্চিত করেছিলেন যে, তারা অনৈতিকতা এবং অজ্ঞতায় পরিপূর্ণ এক সমাজকে রূপান্তর করে একটি পবিত্র ও সৎকর্মপরায়ণ সমাজ গড়ে তুলেছিলেন, এমন এক সমাজ যার কোন তুলনা পৃথিবী ইতোপূর্বে কোনো দিন দেখে নি, এবং যা মানবজাতির জন্য চিরকাল এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।
এই যুগে মহানবী (সা.)-এর দাবির সত্যতার ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখার ফলে, এটি এখন আপনাদের সকলের ওপর দায়িত্ব বর্তায় যে, আপনাদের জীবনের প্রতিটি অংশ, তা আপনার ব্যক্তিগত লেনদেন হোক, বা আপনার অঙ্গীকারসমূহ, বা আপনার ঘোষণা, বা অন্য কোন কিছুই হোক, সকল ক্ষেত্রে আপনি যেন সত্যবাদিতাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেন। নিজের জিহ্বাকে সর্বদা অনৈতিক ও অর্বাচীন বাক্যের উচ্চারণ থেকে মুক্ত রাখুন। আজকের দিন থেকে আপনাদের উচিত পরিপক্কভাবে চিন্তা-ভাবনা ও আচরণ করা, এবং নিজেদের মর্যাদা এবং আপনাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্বের সত্যিকারের গুরুভার অনুধাবন করা। আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি কীভাবে আপনারা অঙ্গীকার করেছেন যে, ধর্মকে সমুদয় পার্থিব বিষয়াদির ওপর প্রাধান্য দান করবেন। আর এটি এমন এক বিষয়ে যাকে কখনো হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

পবিত্র কুরআনে, আল্লাহ্‌ তা’লা বলেন:

وَاَوۡفُوۡا بِالۡعَھۡدِ ۚ اِنَّ الۡعَھۡدَ کَانَ مَسۡـُٔوۡلًا

“এবং তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো, কেননা অঙ্গীকার সম্পর্কে (তোমরা) জিজ্ঞাসিত হবে।”

এ আয়াতে আল্লাহ্ তা’লা স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের জন্য দায়বদ্ধ থাকবে। সুতরাং, এই ভ্রান্তির মধ্যে থাকবেন না যে, এখানে দাঁড়িয়ে থাকা ও খোদ্দামুল আহমদীয়ার আহাদনামার শব্দগুলোর পুনরাবৃত্তি করা-ই যথেষ্ট; বরং আপনাদের উচিত পুরো বিশ্ব ও যুগ-খলীফার সামনে খোলাখুলিভাবে আপনারা যে অঙ্গীকার করছেন এর তাৎপর্য অনুধাবন করা। আপনাদের অবশ্যই প্রতিটি দিনের প্রতিটি মিনিট এই অঙ্গীকার পূর্ণ করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে; এটি জেনে যে, একদিন আল্লাহ্ তা’লার নিকট আপনারা দায়বদ্ধ থাকবেন যে, আপনারা সকলের সামনে ঘোষণা করেছিলেন যে, অন্যান্য সকল কিছুর ওপর ধর্মকে প্রাধান্য দান করবেন। আর যুগ-খলীফার এবং প্রতিশ্রুত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর জামা’তের সঙ্গে পূর্ণ বিশ্বস্ততার অঙ্গীকারের বিষয়েও তিনি আপনাদের হিসাব গ্রহণ করবেন। সুতরাং, নিজেদের ধর্ম, দেশ ও জাতির প্রতি আপনারা যে অঙ্গীকার করেছেন তা পূরণের লক্ষ্যে সৎকর্ম অবলম্বনের মাধ্যমে আল্লাহ্‌ ও তাঁর সৃষ্টির অধিকার আদায় করে এবং সকল সময়ে সর্বোচ্চ নৈতিক মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে নিজেদের সংশোধন করতে আপনাদের সচেষ্ট হতে হবে। প্রত্যেক খাদেমের এটি দায়িত্ব।
আল্লাহ্‌ তা’লা আপনাদেরকে তৌফিক দান করুন, যেন আপনারা তাদের মধ্যে গণ্য হতে পারেন, যারা নিজেদের নামাযের সুরক্ষা করেন এবং যারা সর্বোত্তম নৈতিক গুণাবলী প্রদর্শন করেন। আপনারা তাদের মাঝে গণ্য হোন, যারা সর্বদা সত্যকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেন, এবং যাদের মাঝে সকল প্রকারের মিথ্যার প্রতি এক (প্রকারের) ঘৃণা বিরাজ করে। আপনারা তাদের মাঝে গণ্য হোন, যারা তাদের (দেওয়া) প্রতিশ্রুতি এবং অঙ্গীকারসমূহ রক্ষা করেন, তা যত ছোট বা বড় হোক না কেন। সকল ভালো উদ্দেশ্যে আপনারা কঠোর পরিশ্রমী এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে কাজ করুন। ইসলামের শিক্ষাকে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার যে অঙ্গীকার আপনারা করেছেন তার পূরণকারী আপনারা হোন। মহানবী (সা.) এবং প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ (আ.)-এর শিক্ষার পতাকা পৃথিবীর সকল প্রান্তে পৌঁছানোর আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা এবং প্রবল বাসনায় আপনাদের হৃদয় পূর্ণ থাকুক। আপনারা এমন হোন যাদের জিহ্বা পবিত্র, আর আপনাদের আচরণ সর্বোচ্চ মানের হোক, যেন আপনারা বাকি মানবজাতির সামনে সততা, আন্তরিকতা, নৈতিকতা শেখার জন্য মহান দৃষ্টান্ত হতে পারেন। নিশ্চিতভাবে, যদি এবং যখন আপনারা এমন মার্গে উপনীত হতে পারবেন তখন আপনারা সমাজে নৈতিক বিপ্লব আনয়ন করবেন। আপনারা সেসকল মানুষে পরিণত হবেন, যারা সত্যের এক চিরন্তন লণ্ঠন ঊর্ধ্বে তুলে ধরে বিশ্বকে আলোকিত করবেন এবং অন্ধকার দূরীভূত করবেন।
যেভাবে আমি বলেছি, ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাস এই সাক্ষ্য দেয় যে, নবীন কিশোরগণ প্রকৃত অর্থেই বিশাল এবং অসাধারণ কৃতিত্ব সাধন করেছিলেন। সুতরাং, কখনো নিজেকে অবমূল্যায়ন করবেন না, এ কথা ভাববেন না যে, সমাজে একটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক পরিবর্তন আনার জন্য আপনারা বয়সে অতি তরুণ। আপনাদের বয়স পনেরো, বিশ, ত্রিশ বা চল্লিশ, বা অন্য যা-ই হোক না কেন, ইসলামের সেবার যেকোনো সুযোগকে এমনভাবে হাতে তুলে নিন যেন এটিই আপনার শেষ সুযোগ। এতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই, প্রত্যেক খাদেম, তাদের বয়স, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনুসারে ইসলাম এবং মসীহ্‌ মওউদ (আ.)-এর মিশনের সেবা করতে পারেন; যতক্ষণ তিনি আল্লাহ্‌র ইবাদতের অধিকার এবং তাঁর সৃষ্টির অধিকার পূরণ করেন এবং কখনো সত্যকে পরিত্যাগ করেন না এবং নিজের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতিসমূহ পূরণ করেন। আল্লাহ্‌ তা’লা আপনাদের সকলকে এমনটিই করার তৌফিক দান করুন। আল্লাহ্‌ তা’লা আপনাদের সকলকে আহমদীয়াতের উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত করুন এবং তাদের মধ্যে গণ্য করুন যারা তাদের সৃষ্টির প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করতে সফলকাম হন। আল্লাহ্‌ তা’লা সর্বদিক দিয়ে মজলিস খোদ্দামুল আহমদীয়ার ওপর তাঁর আশিস বর্ষণ অব্যাহত রাখুন। আমীন।
এখন আমার সাথে দোয়ায় যোগদান করুন।

[দোয়ার পর]
একটি ঘোষণা রয়েছে, অনুগ্রহ করে শুনে নিন। মজলিস খোদ্দামুল আহমদীয়া যুক্তরাজ্যের ইশায়াত বিভাগ মাশ’আলে রাহের প্রথম খণ্ডের প্রথম অর্ধাংশের অনুবাদের সৌভাগ্য লাভ করেছে। এই বইটিতে ১৯৩৮ সালে খোদ্দামুল আহমদীয়ার প্রতিষ্ঠালগ্নে হযরত খলীফাতুল মসীহ্ সানী (রা.)-এর প্রদত্ত একেবারে প্রথম ভাষণ থেকে নিয়ে (খোদ্দামুল আহমদীয়ার) প্রাথমিক বছরগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মোট ২৬টি বক্তৃতা ও ১২টি কবিতার অনুবাদ করা হয়েছে। আমি এই সংকলনের ইংরেজি নাম দিয়েছি “বীকন ফর দ্য ইয়ুথ” (যুবসমাজের জন্য আলোকবর্তিকা)। আল্লাহ্‌ তা’লা আমাদের যুবসমাজের তালিম ও তরবিয়তের জন্য এটিকে একটি কল্যাণকর উৎস ও উপকরণে পরিণত করুন। আমীন।
অনুবাদ: আব্দুল্লাহ শামস বিন তারিক