প্রেস বিজ্ঞপ্তি
০২-জানুয়ারি, ২০২৪

শেষযুগ সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণীসমূহের পূর্ণতা: ঈমানোদ্দীপক ভাষণের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হলো জলসা সালানা কাদিয়ান ২০২৩


“মুসলমানদের আনন্দে উদ্বেলিত হওয়া উচিত যে, ইসলামের পুনর্জাগরণের যুগ এসে গেছে” – হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.)

৩১ ডিসেম্বর ২০২৩, এক ঈমানোদ্দীপক বক্তৃতার মধ্য দিয়ে আহমদীয়া মুসলিম জামা’ত কাদিয়ান এবং আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশের বার্ষিক সম্মেলন (জলসা সালানা) সমাপ্ত করেন আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের বিশ্ব-প্রধান ও পঞ্চম খলীফাতুল মসীহ্ হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.)।

হুযূর আকদাস টিলফোর্ডের ইসলামাবাদে অবস্থিত মসরূর হল থেকে অনলাইনে সমাপনী অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন। কাদিয়ানের জলসাগাহে ৪২টি দেশের ১৫,০০০-এর অধিক মানুষ সমবেত হয়েছিলেন।

আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে সেনেগাল, টোগো, গিনি-কোনাক্রি ও গিনি-বিসাউ এর জলসার সমাপনী অধিবেশনও একইসাথে অনুষ্ঠিত হয়।

হুযূর আকদাস তাঁর ভাষণে বলেন যে, প্রতিশ্রুত মসীহ্ ও আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর ভবিষ্যৎবাণী যেভাবে পূর্ণ হচ্ছে তা জামা’তের সত্যতার প্রমাণ।

হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) বলেন:

“সুতরাং বিশ্বজুড়ে দেশে দেশে এই জলসার আয়োজন এবং প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ (আ.)-এর নাম সম্মান ও মর্যাদার সাথে উচ্চারিত হওয়া, এই ঐশী প্রতিশ্রুতির পরিপূর্ণতা, এবং এই বিষয়ের সাক্ষ্য প্রদানকারী যে, তিনিই সেই সত্যিকারের প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ এবং প্রত্যাশিত মাহ্‌দী, যিনি আল্লাহ্‌ তা’লার প্র্রতিশ্রুতি এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণীসমূহের পূর্ণতায় তাঁর (সা.) অধম দাস হিসেবে আগমন করেছেন।”

হুযূর আকদাস উল্লেখ করেন প্রতিশ্রুত মসীহ্ (আ.)-এর সময়ে কীভাবে কাদিয়ান পৃথিবীর নিকট অপরিচিত ছিল; কিন্তু, কেবল তাঁর নামের কারণে এটি এখন সারা বিশ্বে পরিচিত।

“আজ [কাদিয়ানের] এই গণ্ডগ্রামে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ জলসা সালানার উদ্দেশ্যে সমবেত হয়েছেন। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪২টি দেশের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত আছেন। এখানে রুশভাষী দেশসমূহ, আরব দেশসমূহ, আফ্রিকান দেশসমূহ, ইন্দোনেশিয়া এবং অন্যান্য দ্বীপসমূহ, এমনকি ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ থেকে আগত অতিথিবৃন্দ শামিল করেছেন। সুতরাং, এটি আল্লাহ তা’লার প্রতিশ্রুতির পূর্ণতার এক অসাধারণ সৌন্দর্য্য।”

বিশ্বজুড়ে কীভাবে মানুষজনকে আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের দিকে পথ প্রদর্শন করা হচ্ছে এর উদাহরণ দিতে গিয়ে হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) বলেন:

“মুসলমানদের আনন্দে উদ্বেলিত হওয়া উচিত যে, ইসলামের পুনর্জাগরণের যুগ এসে গেছে; ইসলামের দুর্বলতা দূর হওয়ার এবং ইসলামের প্রচার ও প্রসারের যুগ আজ আমাদের সামনে। কিন্তু, তথাকথিত ধর্মীয় ওলামা তাদের নিজ ক্ষুদ্র স্বার্থে সাধারণ মুসলিম জনগণকে সঠিক পথ হতে বিভ্রান্ত করে তাদেরকে এর বিরুদ্ধে উসকে দিচ্ছে। তবে, একটি সময় আসবে যখন তাদেরকেও এই সত্য গ্রহণ করতে হবে। এটিও প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ (আ.)-এর কাছে কৃত আল্লাহ তা’লার একটি প্রতিশ্রুতি যে, শেষ পর্যন্ত এরাও ঈমান আনবে।”

হুযূর আকদাস শেষ যুগ ও মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আগমনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন ভবিষ্যৎবাণীর উল্লেখ করেন। তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মুয্যাম্মেল-৭৩:১৬ আয়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ভবিষ্যদ্বাণী উদ্ধৃত করেন, যেখানে বলা হয়েছে:

“নিশ্চয় আমরা তোমাদের নিকট এক রসূল প্রেরণ করেছি তোমাদের ওপর সাক্ষীস্বরূপ, যেভাবে আমরা ফেরাউনের নিকট এক রসূল পাঠিয়েছিলাম।”

হুযূর আকদাস উল্লেখ করেন যে, উক্ত আয়াতে দুইটি ভবিষ্যৎবাণী আছে যেখানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে এমন একজন নবী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে যিনি হযরত মুসা (আ.)-এর সঙ্গে কতক বিষয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ হবেন। মুসা (আ.) যেমন তাঁর জীবদ্দশায় শত্রুদের ওপর বিজয়ী হয়েছিলেন, তেমনি মহানবী (সা.)-কেও তাঁর জীবদ্দশায় বিজয়সমূহ প্রদান করা হয়েছিল।

আয়াতের দ্বিতীয় ভবিষ্যদ্বাণীটি শেষ ‍যুগ সম্পর্কিত। হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) এ প্রসঙ্গে প্রতিশ্রুত মসীহ্ (আ.)-এর বাণী উদ্ধৃত করে বলেন:

“শেষ যুগ সংক্রান্ত সাদৃশ্য এই যে, খোদা তা’লা মূসায়ী শরীয়তের শেষ দিনগুলোতে এক নবীকে তাদের মাঝে পাঠিয়েছিলেন, যিনি অহিংস ছিলেন, ধর্মযুদ্ধের সাথে যার কোন সম্পর্ক ছিল না, আর যিনি ক্ষমা ও দয়ার শিক্ষা প্রচার করেছিলেন, আর এই ঈসা (আ,) এমন এক সময়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন যখন বনী ইসরাঈলীদের নৈতিক অবস্থা অত্যন্ত মন্দ হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের চরিত্র ও তাদের আচরণে পুরোপুরি ভ্রষ্টতা ছেয়ে গিয়েছিল। তারা তাদের রাজত্ব হারিয়েছিল এবং তারা রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে বসবাস করছিল। মূসা (আ.)-এর পর চতুর্দশ শতাব্দীর শিরোভাগে ঈসা (আ.) আবির্ভূত হয়েছিলেন, এবং তার মাধ্যমে ইসরাঈলী নবীদের ধারা সমাপ্ত হয়েছিল। এই অর্থে তিনি ছিলেন ইসরাঈলী নবুয়তের ধারার শেষ কড়ি।”

এরপর হুযূর আকদাস কুরআনের ৮১ নম্বর সূরা আত-তাকভীর-এর বেশ কয়েকটি আয়াত একাধারে উল্লেখ করেন যেখানে প্রতিটি আয়াতে শেষযুগের নিদর্শনাবলির উপর আলোকপাত করা হয়েছে।
৮১:১১ আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে, “এবং যখন পুস্তকাবলি ছড়িয়ে দেওয়া হবে”, সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে, হুযূর আকদাস বলেন, এটি দ্বারা এমন সময়কে বুঝাচ্ছে যখন পুস্তকাবলি বিপুল সংখ্যায় প্রকাশিত হবে, যা ছাপাখানা, ডাক-যোগাযোগকে নির্দেশ করছে এবং কীভাবে এগুলোর বহুল প্রচলনের ফলে অগণিত বই প্রকাশিত হবে এবং ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে জ্ঞান বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়বে।

হুযূর আকদাস পবিত্র কুরআনের ৮১:৮ আয়াতেরও উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছে, “এবং যখন মানুষকে একত্রিত করা হবে।”

হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) উক্ত ভবিষদ্বাণীর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিশ্রুত মসীহ্ (আ.)-এর উক্তি পেশ করেন যেখানে তিনি বলেন:

“এই ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের মাঝে যে বর্ধিত যোগাযোগ স্থাপিত হবে তার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ এই যে, শেষ যুগে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে এবং ডাক ও তার যোগাযোগ মাধ্যমের উন্নতির কারণে মানবজাতির মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের অনেক বেশি সুযোগ সৃষ্টি হবে। এক দেশ আরেক দেশের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে এবং মানুষ একে অপরের সাথে বিশাল দূরত্বে অবস্থান করা সত্ত্বেও সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে এবং এছাড়াও, বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য চুক্তি এবং অন্যান্য যোগাযোগ স্থাপন হবে যেগুলো বিস্তৃত হতে থাকবে।”

বিগত দশকসমূহে যেসকল অগ্রগতি সাধিত হয়েছে সেটির উল্লেখ করতে গিয়ে হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) বলেন:

“টিভি এবং ইন্টারনেট, আকাশ পথে যোগাযোগ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এই ভবিষ্যদ্বাণীর পরিপূর্ণতার ক্রমাগত প্রমাণ বহন করে। আজ যে মানুষ বিভিন্ন এলাকা থেকে কাদিয়ানে সমবেত হয়েছেন সেটিও এর সত্যতার প্রমাণ। আজ যে প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ (আ.)-এর প্রচারের ফলে ইসলামের বাণী বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছাচ্ছে তাও এর সত্যতার প্রমাণ বহন করে।”

মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর সত্যতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) বলেন:

“যে সকল মানুষ আজকে এখানে কাদিয়ানে সমবেত হয়েছেন এবং এই যে বিশ্বজুড়ে মানুষ আজ এই জলসা সালানা দেখছেন এবং শুনছেন তারা কি আল্লাহ তা’লার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত মসীহ (আ.)-কে প্রদত্ত সাহায্য ও সমর্থনের নিদর্শন নন? কোন নবুয়তের মিথ্যা দাবিকারক কি কখনো এমন সুনামের অধিকারী হতে পারেন, যার ফলস্বরূপ তার নামে বিশ্বজুড়ে স্লোগান উচ্চকিত করা হয়? ১৩৪ বছর অতিবাহিত হয়েছে এবং নবাগত প্রতিটি সূর্যোদয়, আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের অগ্রগতির সংবাদ নিয়ে আসে। সুতরাং, আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের বিরুদ্ধবাদীগণ সজাগ হোন!”

হুযূর আকদাস উল্লেখ করেন অগণিত নিদর্শন এখনো পূরণ হচ্ছে এবং বহু মানুষকে আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের দিকে পথ প্রদর্শন করা হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন আহমদী মুসলমানরা এসকল নিদর্শনের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকভাবে অগ্রগতি সাধন করছে।

এরপর হুযূর আকদাস বিশ্বজুড়ে আহমদী মুসলমানদের উপর আল্লাহ্ তা’লার অনুগ্রহ ও সাহায্যের নানা ঘটনা বিবৃত করেন।

হুযূর আকদাস ইসলামের এই দ্বিতীয় পুনরুজ্জীবনের যুগের জন্য মুসলমানদের আনন্দিত হওয়ার প্রতি জোর দেন।

হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) বলেন:

“আপনারা প্রত্যেকে যারা কাদিয়ানে জলসা সালানায় অংশগ্রহণের জন্য এসেছেন এবং যারা আপনাদের নিজ নিজ দেশে জলসায় যোগদান করছেন তারা এ বিষয়ের সাক্ষী যে, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) সেই প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ এবং মাহ্‌দী যিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী আগমন করেছিলেন এবং যার সমর্থনে সর্বদা আল্লাহ তা’লা সক্রিয় ছিলেন এবং যিনি আল্লাহ্‌র সাহায্য সর্বদা পেতে থাকবেন। প্রত্যেক আহমদী মুসলমানের সর্বদা সচেষ্ট থাকা উচিত যেন তাদের মধ্য দিয়ে প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ (আ.)-এর আগমনের উদ্দেশ্য পরিপূর্ণ হতে থাকে।”

ভাষণের শেষ দিকে হুযূর আকদাস আহমদী মুসলমানদের মনে করিয়ে দেন যেন তারা ফিলিস্তিনিদের জন্য, বিশ্বের মুসলমানদের জন্য ও পাকিস্তানের আহমদী মুসলমান যারা নিজেদের ধর্মবিশ্বাসের কারণে কারারুদ্ধ তাদের জন্য দোয়া করেন। তিনি আরও দোয়া করতে বলেন যেন পৃথিবীতে অবিচার বন্ধ হয়।

হুযূর আকদাস দোয়া করেন যেন নতুন বছর আশিসমণ্ডিত হয় এবং বলেন:

“মুসলিম বিশ্বের ওপর আল্লাহ্‌ তা’লা তাঁর রহমত বর্ষণ করুন। আল্লাহ্‌ তা’লা আহমদীয়া মুসলিম জামা’তকেও উন্নতি দান করুন।”