যুগ-ইমামের প্রয়োজনীয়তা: প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ ও ইমাম মাহদী (আ.) এবং ফিলিস্তিনের জন্য দোয়ার আহ্বান

হযরত মির্যা মসরূর আহমদ - খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই.)

২৪-নভেম্বর, ২০২৩

মসজিদ মুবারক, ইসলামাবাদ, টিলফোর্ড, যুক্তরাজ্য

জুমুআর খুতবার সারমর্ম


এই জুমু’আর খুতবার সারাংশটিতে কোনো প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে তার দায়ভার আহ্‌মদীয়া বাংলা টীম গ্রহণ করছে।

নিখিলবিশ্ব আহমদীয়া মুসলিম জামা’তের বর্তমান ইমাম ও আমীরুল মু’মিনীন হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) গত ২৪শে নভেম্বর, ২০২৩ তারিখে যুক্তরাজ্যের (ইসলামাবাদস্থ) মসজিদ মুবারক-এ “যুগ-ইমামের প্রয়োজনীয়তা: প্রতিশ্রুত মসীহ্‌ ও ইমাম মাহদী (আ.) এবং ফিলিস্তিনের জন্য দোয়ার আহ্বান” বিষয়ক জুমুআর খুতবা প্রদান করেন। প্রদত্ত জুমুআর খুতবায় যুগের চাহিদানুযায়ী হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর আগমনের প্রয়োজনীয়তা এবং তাঁর সত্যতা বর্ণনা করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কতিপয় সহৃদয়বান ব্যক্তির আহমদীয়াত গ্রহণের ঈমান উদ্দীপক ঘটনা বর্ণনা করেন। খুতবার শেষাংশে হুযূর (আই.) সম্প্রতি প্রয়াত কতিপয় নিষ্ঠাবান আহমদীর স্মৃতিচারণ করেন ও নামাযান্তে গায়েবানা জানাযা পড়ান।
তাশাহ্‌হুদ, তা’ঊয ও সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর (আই.) বলেন, হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) তাঁর রচনাসমগ্রে নিজের আগমনের উদ্দেশ্য, বর্তমান যুগে কোনো প্রতিশ্রুত মহাপুরুষের আগমনের প্রয়োজনীয়তা আর যুগের চাহিদানুযায়ী এবং আল্লাহ্ তা’লার সুন্নত ও মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী আল্লাহ্ তা’লার পক্ষ থেকে তাঁর আগমন সম্পর্কে বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করেছেন।
হযরত মসীহ্ মওউদ (সা.) বলেন, “অকাট্য প্রমাণের লক্ষ্যে আমি একথা প্রকাশ করতে চাই যে, খোদা তা’লা এ যুগকে অন্ধকারে নিমজ্জিত পেয়ে আর বিশ্বকে উদাসীনতা, কুফরী এবং শিরকে নিমজ্জিত দেখে ঈমান, সততা, তাকওয়া ও সাধুতাকে ম্লান হতে দেখে আমাকে প্রেরণ করেছেন, যাতে পৃথিবীতে পুনরায় সেই জ্ঞানগত, ব্যবহারিক, নৈতিক ও ঈমানের সত্যতাকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং ইসলামকে যেন তাদের আক্রমন থেকে রক্ষা করেন যারা দর্শন, প্রকৃতিবাদ, স্বেচ্ছাচারীতা, র্শিক এবং নাস্তিকতার পোশাকে এই ঐশী জামা’তের কোনো ক্ষতি করতে চায়। অতএব, হে সত্যের সন্ধানীগণ! প্রনিধাণ করে দেখো! এটি কি সেই সময় নয় যখন ইসলামের জন্য ঐশী সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। এখনও কি তোমাদের কাছে এটি প্রমাণিত হয়নি, বিগত শতাব্দীতে- যেটি ত্রয়োদশ শতাব্দী ছিল (তাতে) ইসলামের ওপর কোন্ কোন্ বিপত্তি আঘাত হেনেছে আর ভ্রষ্টতা ছেয়ে যাওয়ার কারণে কোন্ কোন্ অসহনীয় আঘাত আমাদের সইতে হয়েছে। তোমরা কি এখনও অবগত হও নি যে, কোন্ কোন্ বিপদ ইসলামকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে বা আষ্টেপিষ্টে বেধে রেখেছে। তোমরা কি এখনও এই সংবাদ পাওনি যে, কত মানুষ ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে, কত (মানুষ) খ্রিষ্টধর্মে গিয়ে দীক্ষিত হয়েছে, কত (মানুষ) নাস্তিক ও প্রকৃতিবাদী হয়ে গেছে, শির্‌ক ও বিদআত কত ব্যাপক পরিসরে তৌহীদ ও সুন্নতের জায়গা দখল করে নিয়েছে আর ইসলামের অসারতা প্রমাণের লক্ষ্যে কতবেশি বই-প্রস্তক রচনা করা হয়েছে এবং পৃথিবীতে প্রকাশ করা হয়েছে। কাজেই, তোমরা এখন চিন্তা করে বলো যে, এখন কি খোদা তা’লার পক্ষ থেকে এই শতাব্দীতে এমন কোনো ব্যক্তিকে প্রেরণ করার প্রয়োজন ছিল না? যিনি বহিঃআক্রমনের মোকাবিলা করবেন, যদি প্রয়োজন ছিল তাহলে তোমরা জেনেশুনে (এই) ঐশী নিয়ামতকে অস্বীকার কোরো না এবং সে-ই ব্যক্তি হতে মুখ ফিরিয়ে নিও না- যাঁর আগমন এই শতাব্দীতে, এই শতাব্দীর অবস্থার নিরিখে অপরিহার্য ছিল। আর শুরু থেকেই মহানবী (সা.) যার সংবাদ দিয়েছিলেন।”
এরপর তিনি (আ.) কোনো আগমনকারীর সত্যতা যাচাইয়ের মানদণ্ডের উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, “অতএব হে সত্যান্বেষীগণ! চিন্তা করে দেখো, এটি কি সেই সময় নয় যখন ইসলামের জন্য ঐশী সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। এখনও পর্যন্ত কি তোমাদের কাছে এটি বোধগম্য হয়নি যে, বিগত তের শতাব্দীতে ইসলামের ওপর কি দুর্দশা আরোপিত হয়েছে এবং পথভ্রষ্টতা ছড়ানোয় কি কি অসহনীয় কষ্ট আমাদেরকে সহ্য করতে হয়েছে? তোমরা কি এখনও পর্যন্ত অনুধাবন করো নি যে, কি ধরনের বিপদাবলী ইসলামকে পরিবষ্টেন করে রেখেছে? তোমরা কি এ সংবাদ লাভ করো নি যে, কত মানুষ ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে! কত মানুষ খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছে! কত মানুষ নাস্তিক এবং প্রকৃতিবাদি হয়ে গেছে এবং কীরূপ শির্‌ক ও বিদাত, একত্ববাদ ও সুন্নতের স্থান দখল করেছে আর ইসলামের বিরুদ্ধে সমগ্র পৃথিবীতে কি পরিমাণ পুস্তকাদি প্রকাশ এবং প্রচার করা হয়েছে! কাজেই তোমরা চিন্তা করে বলো, এখনও কি খোদা তা’লার পক্ষ থেকে এ শতাব্দীতে এক ব্যক্তির আগমন আবশ্যক নয়; যিনি বাইরের বিরোধীদের আক্রমণের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হবেন। যদি প্রয়োজনীয়তা থাকে তাহলে তোমরা জেনেশুনে খোদার নিয়ামতকে বাঁধাগ্রস্ত কোরো না এবং এ ব্যক্তির কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না যার আগমন এ শতাব্দীর প্রয়োজন অনুসারে অপরিহার্য ছিল এবং সূচনাতেই মহানবী (সা.) যার সুসংবাদ দিয়েছিলেন।”
এই ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে আল্লাহ্ তা’লা হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-কে প্রেরণ করেছেন এবং তাকে বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছেন। তাঁর জীবদ্দশায় এবং পরবর্তীতেও আল্লাহ্ তা’লা তাকে সমর্থন করেছেন এবং তাঁর স্বপক্ষে অগণিত নিদর্শন দেখিয়েছেন। বর্তমানেও আহমদীয়াতের উন্নতির ধারা, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের এ জামা’তে যোগদান করা এবং সদস্যদের কুরবানীর মান প্রতিনিয়ত সমুন্নত হওয়া মূলত তাঁর সত্যতার-ই অকাট্য প্রমাণ বহন করে। এখন এমন কোনো দেশ নেই যেখানে ইসলাম আহমদীয়াতের বাণী পৌঁছায়নি, যেখানে সৌভাগ্যবানরা এর কল্যাণে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে না এবং ইসলাম আহমদীয়াত গ্রহণ করছে না। অনেক স্থানে সরাসরি খোদা তা’লা তাদের পথপ্রদর্শন করছেন এবং তারা জামা’তে যোগদান করছেন। বিরোধীদের অনবরত বিরোধিতা সত্ত্বেও জামা’তের সদস্যদের ঈমানকে আল্লাহ্ তা’লা ক্রমশ সুদৃঢ় করে চলেছেন। এরপর হুযূর (আই.) বিশ্বব্যাপী আহমদীয়াত গ্রহণের বেশ কয়েকটি ঈমান উদ্দীপক ঘটনার উল্লেখ করেন।
কিরগিজিস্তানের বাবাইও ইসলাম বেক সাহেব লিখেছেন, আমার পত্র লেখার কারণ হলো, আমি ইমাম মাহদী (আ.)-এর হাতে বয়আত করে প্রকৃত ইসলামে যোগদান করেছি। আহমদীয়াতে যোগদানের কারণ হলো, এ যুগে একমাত্র ইমাম মাহদী (আ.)-ই ইসলামের সৌন্দর্য উত্তমরূপে তুলে ধরেছেন। আমার দৃঢ়বিশ্বাস জন্মেছে যে, কেবলমাত্র ইমাম মাহদীই এরূপভাবে ইসলামের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে পারেন। তাই আমার জন্য দোয়া করুন যেন আমি মুত্তাকী হতে পারি এবং বয়আতের দশটি শর্ত ষোলোআনা পালন করতে পারি।
কঙ্গোর মানিমা প্রদেশের রোদিকা নামক স্থানের এক খ্রিষ্টান বন্ধু ফিরোজ মাজেক সাহেবের কাছে জামা’তের লিফলেট পৌঁছে যেখানে ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমনের সংবাদ এবং আহমদীয়া জামা’তের খিলাফত ব্যবস্থাপনার অনুগ্রহ সম্পর্কে বর্ণিত ছিল। এটি পড়ে তার চিন্তাধারা পাল্টে যায় এবং তিনি বলেন, আমি এই ইসলামের সন্ধানেই ছিলাম। এরপর তিনি বয়আত করেন। অনুরূপভাবে আরেক বন্ধু হুসাইন সাহেব লিফলেট পড়ে শুধু বয়আতই করেন নি, বরং তবলীগ করতেও আরম্ভ করেছেন এবং তার তবলীগে এখনো পর্যন্ত পাঁচজন বয়আত করেছেন। কাজেই, পুরোনো আহমদীদেরও তবলীগের প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিত।
তানজানিয়ার শিয়াঙ্গা অঞ্চলের মোঙ্গালাঙ্গা জামা’তে যখন আহমদীয়াতের সূচনা হয় তখন শুরুতে আহমদীরা গাছের ছায়ায় নামায পড়তো। এরই মাঝে সেখানে এক ব্যক্তি মুহাম্মদ ফুঙ্গুঙ্গা জামা’তের প্রচণ্ড বিরোধিতা আরম্ভ করে। আর কয়েকজনের সাথে মিলে এই অপপ্রচার করে যে, এই আহমদীরা তো মুসলমানই নয়। আর আমরা মুসলমানরা খুব শীঘ্রই এখানে মসজিদ নির্মাণ করব। উক্ত ব্যক্তি একজন স্বচ্ছল মহিলার কাছ থেকে এই নিশ্চয়তাও নিয়ে নেয় যে, সে মসজিদের জন্য অর্থ সরবরাহ করবে। অপরদিকে যখন একজন নিষ্ঠাবান আহমদী রমযান সাহেব নিজের জমি মসজিদের জন্য দান করেন তখন সেই ব্যক্তি অনেক চেষ্টা করে যেন কোনোভাবে এই জমিটি অ-আহমদী মুসলমানরা পেয়ে যায়, কিন্তু সেই আহমদী অবিচল থাকেন। এমনকি জামা’তের মসজিদের নির্মাণকাজ আরম্ভ হয় আর তা সম্পন্নও হয়ে যায়। এরই মাঝে আহমদীয়া জামা’তের তবলীগ সেই বিরোধী ব্যক্তির বাড়িতেও পৌঁছে যায় আর আল্লাহ্ তা’লা তার স্ত্রী ও সন্তানদের আহমদীয়াত গ্রহণের সৌভাগ্য দান করেন। হুযূর বলেন, এখন সে একাই বিরোধিতা করছে। এখন যদি এই ব্যক্তির মাঝে জ্ঞান থাকে তাহলে তাদের জন্য এই নিদর্শনই যথেষ্ট যে, বিরোধিতা সত্ত্বেও আল্লাহ্ তা’লা তার স্ত্রী-সন্তানদের হৃদয়ে প্রকৃত ইসলামের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন আর তার কোনো প্রভাব এখানে কাজে আসেনি। এরূপ ঈমান আর এরূপ পরিবর্তন কি কোনো মানুষ সৃষ্টি করতে পারে? কখনোই না। এটি কেবলমাত্র আল্লাহ্ তা’লার বিশেষ অনুগ্রহেই হয়ে থাকে।
এরপর ঈমানের দৃঢ়তা এবং আল্লাহ্ তা’লার সমর্থনের আরেকটি উদাহরণ রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা হতে। একটি ছিল আফ্রিকার, আরেকটি ছিল রাশিয়ার। আর এটি হলো আমেরিকা। সেখানকার একজন নারী মেরিলা সাহেবা। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তিনি মুসলমানদের ব্যবহারিক অবস্থার কারণে ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলেন। তিনিও সত্য অনুধাবন করে আহমদীয়াতের কোলে আশ্রয় নিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের একজন নবাগতা আহমদী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কতিপয় আহমদী ছাত্রের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। তাদের সাথে ইসলাম আহমদীয়াত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রথমে আমি তাকে প্রমাণ করতে চেয়েছি যে, সুন্নি ইসলামই প্রকৃত ইসলাম। কিন্তু এ ধরনের আলোচনার ফলে আমার আহমদীয়াত সম্পর্কে গবেষণা করার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। আমি আহমদীয়া জামা’তের ওয়েব সাইট সম্পর্কে জানতে পারি। সেখানে অনেক সাহিত্য এবং ভিডিও দেখি। আমার মনে ইসলাম সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন ছিল যার প্রশান্তিদায়ক কোনো উত্তর পাইনি, কিন্তু যখন আহমদীয়া জা’মাতের সাহিত্য পড়তে থাকি তখন ধীরে ধীরে সেগুলোর উত্তরও পেতে থাকি। এরপর তিনি একাধিক স্বপ্নও দেখেন যেগুলোর মাধ্যমে তিনি সত্য পথের নিদর্শন লাভ করেন এবং অবশেষে বয়আত গ্রহণ করেন।
বুরকিনা ফাঁসোর ডোরি রিজিওনের এক আহমদী যুবক জাবের সাহেব জমিতে কাজ করছিলেন। সন্ত্রাসীরা তাকে ধরে ফেলে এবং বলে, গতকাল যেভাবে আমরা মাহদীয়াবাদে আহমদীদের হত্যা করেছি তোমাকেও সেভাবে হত্যা করব। এরপর তার মোবাইল নিয়ে চেক করে যেখানে জামা’তের মুবাল্লিগদের বক্তৃতা ছিল। বক্তৃতা শুনে তারা বলতে থাকে, আমরা তো একেই খুঁজছি কেননা এই ব্যক্তি রেডিওতে আহমদীয়াতের তবলীগ করে। এভাবে আহমদী যুবকের কাছে তার পিতার খবর নেয় এবং বলে, আগামীকাল আমরা তোমাদের গ্রামে আসব। তখন তিনি তার পিতা ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অন্যত্র চলে যান। তারা এসে ঘরের সমস্ত জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে দেয় এবং বলতে থাকে, এখানে যে আহমদীরাই থাকে তাকে হত্যা করা হবে। হুযূর (আই.) বলেন, বুরকিনা ফাসোর আহমদীদের শহীদ করার পরও তাদের ঈমান দুর্বল হয়নি, বরং প্রতিনিয়ত তাদের ঈমান সুদৃঢ় হচ্ছে। তারা বাড়িঘর সবকিছু ফেলে চলে যায়, কিন্তু আহমদীয়াত পরিত্যাগ করেনি। তারা মাত্র কিছুকাল আগেই আহমদীয়াত গ্রহণ করেছে, কিন্তু ঈমানে উন্নতি করে যাচ্ছে। এটি আল্লাহ্ তা’লার সমর্থন ছাড়া কখনোই সম্ভব নয়।
সেনেগালের তাম্বাকুন্ডা অঞ্চলে একটি তবলীগি অধিবেশন হয়। সেখানে কয়েক বছর পূর্বে এক ভদ্রলোক স্ত্রী-সন্তানাদি সহ আহমদীয়াত গ্রহণ করেন ফলে গ্রামের লোকেরা বিরোধিতা করছিল। এ বছর গ্রামপ্রধান এবং ইমামের সাথে বারবার সাক্ষাৎ করে সেখানে একটি তবলীগি অধিবেশনের আয়োজন করা হয়। মুয়াল্লিম সাহেবগণ ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমনের প্রয়োজনীয়তা এবং আহমদীয়াত সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন এবং প্রশ্নোত্তর সভা হয়। তৎক্ষণাৎ কিছু মানুষ বয়আত গ্রহণ করেন। এরপর গ্রামের ইমাম দাঁড়িয়ে আহমদীয়াতের সত্যতা ঘোষণা করেন। অতঃপর গ্রামপ্রধান তার পরিবারসহ আহমদীয়াত গ্রহণ করেন এবং বলেন, যদি কারো মনে কোন দ্বিধা বা প্রশ্ন থাকে তাহলে এখনই পরিস্কার হয়ে নিন, যাতে পরবর্তীতে কোনো সমস্যার সৃষ্টি না হয়। এরপর উপস্থিত সবাই পরিবারসহ আহমদীয়াত গ্রহণ করেন, আলহামদুলিল্লাহ্।
এরপর, দেখুন! আল্লাহ্ তা’লা বিরোধীদেরকেও কীভাবে জামা’তের প্রতি আকৃষ্ট করছেন! এরও অগণিত ঘটনা রয়েছে। মালি কোলি কোরো অঞ্চলের একটি স্থানের নাম হলো নেমনা। এবছর সেখানে জামা’তের আঞ্চলিক জলসা পূর্বে রেডিওতে ঘোষণা করা হয়। এই গ্রাম দূরবর্তী হওয়ার কারণে কখনো রেডিও’র বাণী শোনা যায় আবার কখনো শোনা যায় না। কিন্তু সেই দিনগুলোতে সেখানে রেডিও’র বাণী শোনা যায়। সাদিক জারাহ্ সাহেব রেডিওতে আহমদীয়াত সম্পর্কে শুনতে পান। কিন্তু তার এক বন্ধু আহমদীয়াত সম্পর্কে খুবই মন্দ ধারণা রাখত। তিনি তাকে আহমদীয়াতের কথা বললে নেতিবাচক উত্তর দিত। এরপর এই দু’জন উক্ত জলসায় যান। উভয়েই জলসার পরিবেশ দেখে অত্যন্ত প্রভাবিত হন এবং সাদিক জারাহ্ সাহেব আহমদীয়াত গ্রহণ করেন। আর তার বন্ধু যিনি আহমদীয়াতের মন্দ দিকগুলো খুঁজতে সেখানে গিয়েছিলেন, কিন্তু জলসার পরিবেশে প্রভাবান্বিত হয়ে তিনিও আহমদী হয়ে যান।
কঙ্গো ব্রাজভিলের এক যুবক মিষ্টার সিরিয়াল সাহেব উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে এক মিশনারীর কাছে খ্রিষ্টধর্মের শিক্ষা গ্রহণ করছিল। এ সময় আমাদের স্থানীয় মুবাল্লিগের সাথে তার পরিচয় হয়। মুবাল্লিগ সাহেব বলেন, আমি তাকে তবলীগ করি। তিনি দেখেন, জামা’তে আহমদীয়ার দলীলের বিপরীতে তার কাছে বা তার মিশনারী শিক্ষকের কাছে কোনো উত্তর নেই। এভাবে তিনি খ্রিষ্টান মিশনারী হওয়ার পরিবর্তে বয়আত করে আহমদীয়াত গ্রহণ করেন আর এখন দাঈ ইলাল্লাহ্ হিসেবে আহমদীয়াতের প্রচার করছেন।
এরপর হুযূর (আই.) ইউরোপ, আফ্রিকা, রাশিয়া ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের আরও কিছু ঈমান উদ্দীপক ঘটনা বর্ণনা করেন যা থেকে প্রমাণ হয় যে, আল্লাহ্ তা’লা স্বয়ং মানুষজনকে যুগ ইমামের প্রতি আকৃষ্ট করছেন এবং তারা সত্যগ্রহণ করে ধন্য হচ্ছেন।
খুতবার শেষাংশে হুযূর (আই.) বিগত কয়েক জুমুআর ন্যায় আজও ফিলিস্তিনের নির্যাতিত-নিপীড়িত মুসলমানদের জন্য দোয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আল্লাহ্ তা’লা ফিলিস্তিনবাসী আমাদের মুসলমান ভাইদেরকে এই অত্যাচার ও নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি দিন। বর্তমানে কয়েক দিন যাবত যুদ্ধ বিরতি চলছে, যেন মৌলিক চাহিদাসমূহ সেখানে সরবরাহ করা যেতে পারে। কিন্তু এরপর কি হবে? ইসরাঈলী প্রশাসনের দুরভিসন্ধি ভয়ংকর মনে হচ্ছে। তারা পুনরায় যুদ্ধ শুরু করতে চায়। যাহোক, পরাশক্তিগুলো বাহ্যত এখন সহানুভূতির কথা বললেও তারা ন্যায়বিচার করতে চায় না। তারা বুঝতে পারছে না যে, যুদ্ধ সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিচক্ষণরা এ কথা বলতেও আরম্ভ করেছে যে, এ যুদ্ধ কেবলমাত্র এই এলাকার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাইরেও ছড়াবে এবং তাদের দেশেও ছড়িয়ে পড়বে। মুসলমান রাষ্ট্রগুলো এখন কিছুটা আওয়াজ উত্তোলন শুরু করেছে, কিন্তু মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে আওয়াজ তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে পরিপূর্ণ চেষ্টা চালাতে হবে। যদি তাদের মাঝে এরূপ চিন্তাভাবনার উদয় হয় তাহলে আল্লাহ্ তা’লা তাদের এ মানসিকতাকে কাজে পরিণত করার তৌফিক দিন। যাহোক, আপনারা দোয়ার প্রতি মনোযোগ দিন।
পরিশেষে হুযূর (আই.) কয়েকজন প্রয়াত ব্যক্তির সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ করেন এবং নামাযের পর তাদের গায়েবানা জানাযা পড়ানোর ঘোষণা দেন। তারা হলেন, যথাক্রমে মুরুব্বী সিলসিলাহ্ মুকাররম আব্দুস সালাম আরেফ সাহেব, বায়তুল মাল ব্যয়বিভাগের সাবেক নায়েব নাযের মুকাররম মুহাম্মদ কাসেম খান সাহেব, জামা’তের বিখ্যাত কবি মুকাররম আব্দুল করীম কুদসী সাহেব, মুকাররম মিয়া রফিক আহমদ গোন্দল সাহেব এবং আমেরিকা নিবাসী মুকাররমা নাসিমা লাইক সাহেবা। হুযূর (আই.) প্রয়াতদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে দোয়া করেন এবং মরহুমদের পরিবার-পরিজনকে তাদের সৎগুণাবলী ধরে রাখার তৌফিক লাভের জন্যও দোয়া করেন।