In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.

Love for All, Hatred for None.

Browse Ahmadiyya Bangla

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ

জুমুআর খুতবা

সহানুভূতিশীলতার আদর্শ হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)

সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্‌ আল্‌ খামেস (আই:)

বাইতুল ফুতুহ্‌ মস্‌জিদ, লন্ডন, ইউকে

২৩শে ফেব্রুয়ারী, ২০০৭ইং

“পাশ্চাত্যের কোন না কোন দেশে প্রত্যহ ইসলাম এবং মহানবী (সাঃ)-এর বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে নোংরা অপপ্রচার করে তাঁর (সাঃ) মর্যাদাহানীর অপচেষ্টা করা হয়।”

“হল্যান্ডের জনৈক সাংসদের পক্ষ থেকে মহানবী (সাঃ), ইসলামী শিক্ষা ও পবিত্র কুরআন সম্পর্কে অত্যন্ত বাজে এবং অন্যায় মন্তব্যের জোরদার সমালোচনা।”

“সৃষ্টির অন্ধ পূজারীরা এ সম্মানিত রসূল (সাঃ)-কে চিনতে পারেনি, যিনি প্রকৃত সহানুভূতির সহস্র সহস্র দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।”

“আহ্‌মদীদের অনেক বড় দায়িত্ব হচ্ছে নিজেদের জীবনে ইসলামী শিক্ষা বাস্তবায়ন করতঃ এ স্নেহশীল ও দয়ালু নবী (সাঃ)-এর জীবনের প্রতিটি সুন্দর মূহুর্তের ছবি তাদের কাছে পৌঁছানো এবং বলা যে, মানবতার এ হিতৈষী আর আল্লাহ্‌র প্রিয় নবী (সাঃ)-এর উপর আক্রমন বন্ধ কর।”

أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*

بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)

উচ্চারণ: আশহাদু আন্‌ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্‌ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্‌ যোয়াল্লীন। (আমীন)

لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَحِيمٌ

(সূরা আত্‌ তওবাহ্: ১২৮)

এটি সুবিদিত কথা যে, আল্লাহ্‌ তা’আলা স্বীয় বৈশিষ্ট্যাবলীর মাধ্যমে আমাদের সম্মুখে স্বীয় সত্ত্বাকে প্রকাশ করেন। মু’মেন বান্দাদের আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন, আমার রঙ ধারণ করো, আমার রঙে রঙ্গীন হও এবং আমার গুণাবলী অবলম্বন করো তবেই তোমরা আমার প্রকৃত বান্দা আখ্যায়িত হতে পারবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্‌ তা’আলার এ নির্দেশনার সর্বোত্তম প্রতিফলন মহানবী (সাঃ) ব্যতীত আর কারো মাঝে পরিলক্ষিত হয় না। কেননা তিনি (সাঃ)-ই আল্লাহ্‌ তা’আলার সে-ই প্রিয়ভাজন যাঁর জ্যোতির মাধ্যমে বিশ্ব নিজ স্রষ্টাকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে কল্যাণ মন্ডিত হয়েছে, হচ্ছে এবং ইনশাআল্লাহ্‌ হতে থাকবে।

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) মহানবী (সাঃ)-এর কল্যাণময় সত্ত্বার চিত্র এভাবে অঙ্কন করেছেন। তিনি (আঃ) বলেন,

“সে মানব যিনি তাঁর অস্তিত্বে, গুণাবলীতে, কাজে-কর্মে, তাঁর নিরন্তর তৎপরতায় এবং তাঁর আধ্যাত্মিক ও পবিত্র বৃত্তি ও শক্তির মাধ্যমে, জ্ঞানে, কর্মে, সাধুতা ও দৃঢ়তায় সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এবং ইনসানে কামেল বা পরিপূর্ণ মানবরূপে অভিহিত হয়েছেন.....সে ইনসান যিনি সর্বাপেক্ষা কামেল বা পরিপূর্ণ আর প্রকৃত অর্থেই যিনি পূর্ণ মানব এবং পরিপূর্ণ নবী এবং পরিপূর্ণ আশিস ও কল্যাণ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন যাঁর আধ্যাত্মিক অভ্যূত্থান ও পুনরুত্থানের ফলে পৃথিবীতে প্রথম কিয়ামত প্রদর্শিত হয়েছে এবং তাঁর আগমনে একটি মৃত জগৎ পুনর্জীবন লাভ করেছে।” সে কিয়ামত কি ছিল, তা ছিল মৃতদের জীবিত করা। “সে আশিস মন্ডিত নবী হচ্ছেন হযরত খাতামুল আম্বিয়া, সুফীদের ইমাম, খাতামুল মুরসালীন, নবীদের গর্ব, জনাব মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। হে আমাদের খোদা! তুমি এ প্রিয়তম নবীর উপর সে-ই রহমত ও দরূদ বর্ষণ করো যা তুমি পৃথিবীর আদিকাল থেকে অদ্যাবধি অন্য কারো উপরে বর্ষণ করোনি..................................................

اللھم صلی و سلم بارک علیہ و الہ و اصحابہ اجمعین

(ইতমামুল হুজ্জাতে আলাল্লাজী লাজ্জা ওয়া যাগা আনীল মাহাজ্জাতে, রূহানী খাযায়েন-৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা: ৩০৮)

সুতরাং ইনি হলেন আমাদের নবী (সাঃ) যিনি খোদাতা’লার ভালবাসার কারণে তাঁর রঙে রঙ্গীন হয়ে ঐশী গুণাবলীর বাস্তব প্রতিফলন হয়ে দেখিয়েছেন।

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) অন্যত্র বলেন,

“তিনি খোদার প্রতি সর্বোচ্চ পর্যায়ের ভালবাসা রাখতেন আর মানব জাতির প্রতি পরম ভালবাসায় তাঁর প্রাণ বিগলিত হয়।”(হাকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন-২২তম খন্ড, পৃষ্ঠা: ১১৯)

অতএব খোদার সাথে তাঁর পরম ভালবাসার কারণেই তিনি (সাঃ) তাঁর সৃষ্টির প্রতিও ভালবাসা প্রদর্শন করেছেন। সৃষ্টির কষ্ট তিনি সইতে পারতেন না। আল্লাহ্‌ তা’আলা যেখানে স্বীয় সৃষ্টির সাথে রহ্‌মানিয়্যাত এবং রহীমিয়্যাত বৈশিষ্ট্যের আলোকে ব্যবহার করেন সেখানে সে সত্তা যাঁর উঠা-বসা, যাঁর সকল গতি ও স্থিতি, আল্লাহ্‌ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ছিল, তিনি (সাঃ) খোদার বান্দাদের সাথে সেরূপ ব্যবহার করবেন না এটি কিভাবে সম্ভব? তাঁর মধ্যে সৃষ্টির জন্য যে রহীমিয়্যাত ও রহ্‌মানিয়্যাতের প্রেরণা ছিল, সে সুবাদে সৃষ্ট ভালবাসা এত গভীর, এত প্রবল এবং এত বেশী ছিল যে, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্‌ তা’আলা তা সে বাক্যে সংরক্ষণ করেছেন যা আমি তেলাওয়াত করেছি। এর অর্থ হচ্ছে, নিশ্চয় তোমাদের মধ্য থেকে এক মহান রসূল তোমাদের কাছে এসেছেন, তোমাদের কষ্টে পতিত হওয়া তাঁর জন্য দুঃসহ, তিনি তোমাদের অতিশয় শুভাকাঙ্খী, মু’মেনদের প্রতি তিনি পরম মমতাশীল, দয়াময়।

এ হলো আমাদের নবী (সাঃ)-এর আদর্শ এবং মানব জাতির কল্যাণের জন্য তাঁর (সাঃ) প্রেরণা। সে-ই প্রিয় রসূল (সাঃ) প্রচন্ড কষ্ট পান যখন তোমরা কষ্টে নিপতিত হও বা আল্লাহ্‌ তা’আলার নির্দেশাবলী অনুসরণ না করার কারণে নিপতিত হবে। এ আয়াতে বিশ্বাসী অবিশ্বাসী উভয়ের জন্য ভাবের বহিঃপ্রকাশ রয়েছে। আমরা দেখতে পাই যে, তাঁর (সাঃ) জীবনে শত্রুদের পক্ষ থেকে হেন দুঃখ-কষ্ট ছিলনা যা তাঁকে এবং তাঁর অনুসারীদের দেয়া হয়নি। মহিলাদের পা উটের সাথে বেঁধে তাদের চিরে ফেলা হয়েছে। স্বয়ং তাঁকে (সাঃ) চ���ম যাতনা দেয়া হয়েছে। আড়াই বছর তাঁকে অনুসারীদের সাথে একটি ঘাঁটিতে অবরুদ্ধ রাখা হয়, এতদসত্বেও তিনি ছিলেন তাদের কল্যাণকামী। তারা যাতে আল্লাহ্‌ তা’আলার শাস্তি থ���কে রক্ষা পেত��� পারে সে ��দ্দেশ্য যে দোয়া করতেন, আল্লাহ্‌ তাদের হেদায়েত দিন এবং সরল-সঠিক পথে পরিচালিত করুন। প্রতিরোধও কেবল আত্মরক্ষার সীমা পর্যন্ত ছিল, এর বেশী নয়। প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার কোন প্রশ্নই নেই, এর নামগন্ধও তাঁর হৃদয়ে ছিল না। তাদেরকে বাঁচানোর জন্য এতবেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, নিজের প্রাণ বিনষ্ট করছিলেন; যেমন কিনা কুরআনে উল্ল্যেখ আছে। যখন আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁকে বললেন, এ কাফের, মুশরেক আর আল্লাহ্‌র প্রতি পুত্র আরোপকারীদের সাবধান করো যে, যদি তোমরা বিরত না হও তাহলে একটি শাস্তি তোমাদের গ্রাস করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তোমরা তাতে ধৃত হতে যাচ্ছ। তখন সে-ই রহমাতুল্লিল আলামীন একান্ত অস্থির এবং কষ্টদায়ক অবস্থার মাঝে দিন কাটাতেন। ব্যাকুল হয়ে তাদের সরল-সোজা পথে আসার জন্য আল্লাহ্‌ তা’আলার সমীপে আকুতি মিনতি করতেন, দো া করতেন আর তাদের কাছে সত্যের বাণী পৌঁছাতেন। লোকদের বলতেন, কেন তোমরা তোমাদের ইহ ও পরকাল বিনষ্ট করতে তৎপর হচ্ছ? কেন নিজেদের জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করছ? অবস্থা এমন হয়েছিল যে আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,

فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَفْسَكَ عَلَى آثَارِهِمْ إِنْ لَمْ يُؤْمِنُوا بِهَذَا الْحَدِيثِ أَسَفاً

(সুরাতুল কাহফ: ৭)

অতএব যদি তারা এ মর্যাদাপূর্ণ বাণীর উপর ঈমান না আনে তাহলে তুমি কি তাদের জন্য দুঃখ-কষ্টে আত্মবিনাশ করে ফেলবে? সুতরাং মানুষকে আল্লাহ্‌ তা’আলার শাস্তি থেকে বাঁচানোর জন্য এ ছিল মূর্তিমান দয়া (সাঃ)-এর প্রেরণা, এ চিন্তাই তাঁকে এরূপ পরিস্থিতিতে নিপতিত করেছিল যে, নিজ প্রাণকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন। আজ কেউ বলতে পারবে কি! কারো পিতাও নিজ সন্তানদের ইহ ও পরকালকে সুন্দর করার লক্ষ্যে ততটা উদ্বিগ্ন হন যতটা তিনি (সাঃ) তাদের জন্য হতেন? যাদের সাথে তাঁর সম্পর্ক কেবল এটুকু ছিল যে, এরা তাঁর প্রিয় প্রভুর সৃষ্টি। নিজ সৃষ্টির প্রতি আল্লাহ্‌ তা’আলার ভালবাসার সুবাদে তাদেরকে শয়তানের খপ্পর থেকে রক্ষার জন্য তিনি তাঁকে প্রেরণ করেছেন, আর তাঁর (সাঃ) উদ্দেশ্য কেবল এটিই ছিল যেন তিনি এ দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালনকারী হতে পারেন।

তিনি মু’মেনদের কতবড় শুভাকাঙ্খী ছিলেন এ আয়াতে তারও বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ঈমান আনয়নকারীদের দেখে তাঁর বড় আনন্দ হতো আর তাদেরকে বিভিন্নভাবে আল্লাহ্‌ তা’আলার ভালবাসা এবং নৈকট্য অর্জন করার লক্ষ্যে তিনি পথ প্রদর্শন করতেন। সবসময় এ চিন্তাই ছিল যে, আমার মান্যকারীরা যেন সদা খোদার রহমতের চাঁদরে আবৃত থাকে। হাদীস থেকে দু-একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি।

হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) বর্ণনা করেন যে,

তিনি নবী করীম (সাঃ)-এর সমীপে নিবেদন করেন; আপনি নামাযে পাঠ করার জন্য আমাকে কোন দোয়া শিখান। তিনি (সাঃ) বলেন, “তুমি বল হে আল্লাহ্‌! নিশ্চয় আমি আমার প্রাণের উপর অন্যায় করেছি আর তুমি ব্যতীত কেউ পাপ ক্ষমাকারী নেই। তুমি নিজ সন্নিধান থেকে আমাকে ক্ষমা কর এবং আমার প্রতি দয়া কর। নিশ্চয় তুমিই ক্ষমাশীল এবং পরম দয়ালু।” (বুখারী কিতাবুল আযান, বাবুদ্‌ দোয়ায়ে ক্ববলাস্‌ সালামে- হাদীস নাম্বার: ৮৩৪)

আরেকটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছেঃ

হযরত আবু হুরায়রাহ্‌ (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সাঃ) বলেছেনঃ

“তোমাদের মধ্যে থেকে যে ব্যক্তি কোন অপছন্দনীয় কথা না বলে, যদি নিজের নামাযের সে স্থানে অপেক্ষা করে যেখানে সে নামায আদায় করেছে, তাহলে ফিরিশতা তার জন্য এভাবে দোয়া করে; হে আল্লাহ্‌! একে ক্ষমা কর। হে আল্লাহ্‌! এর প্রতি দয়া কর।” (বুখারী কিতাবুস্‌ সালাত, বাবুল হাদীসে ফীল মাসজিদে - হাদীস নাম্বার: ৪৪৫)

এটিও উদ্বুদ্ধ করার জন্য যে নামাযের জন্য আস, আল্লাহ্‌র ক্ষমা ও দয়া অন্বেষণ করো এবং আল্লাহ্‌র ভালবাসা বেশি বেশি অর্জনকারী হও।

এরপরে মু’মেনদের জন্য মূর্তিমান কল্যাণ রূপে তিনি শুভাকাঙ্খীতার কেমন পরাকাষ্ঠা ছিলেন তা দেখুন। এক বর্ণনায় এসেছে,

হযরত আবু হুরায়রাহ্‌ (রাঃ) বলেন যে,

তিনি নবী করীম (সাঃ)-কে একথা বলতে শুনেছেন; “হে আল্লাহ্‌! কোন মু’মেনকে যদি আমি কটু কথা বলে থাকি তাহলে কিয়ামত দিবসে সেই কথাকে তুমি তার জন্য তোমার নৈকট্য লাভের একটি মাধ্যমে পরিণত করো।(বুখারী কিতাবুদ্‌ দাওয়াত, বাবু ক্বওরুন নবী (সাঃ) আযিতুহু ফাজায়ালাহু যাকাতু ওয়া রহ্‌মাতু - হাদীস নাম্বার: ৬৩৬১)

অর্থাৎ আমার কঠোরতাও যেন তার জন্য রহমতে পরিণত হয়। তিনি এতটা রউফ এবং রহীম ছিলেন যে, ভুল বশতঃ বা কোন কারণে ইচ্ছে করেও যদি কাউকে কিছু বলে থাকেন তাহলে তারও যেন শাস্তি না হয় বরং তা যেন রহমতের কারণ হয়। অতএব ইনি হলেন আমাদের নবী (সাঃ) যিনি পরম মমতাশীল ও একান্ত দয়ালু। আল্লাহ্‌ তা’আলা যাঁকে ‘রউফ’ ও ‘রহীম’ নামে অভিহিত করেছেন, যিনি আপন লোকদের মান উন্নত করার জন্যও উদ্বিগ্ন আর অপরকেও শাস্তি থেকে রক্ষার জন্য অস্থির। এ সম্পর্কে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) বলেন,

“আকর্ষণী বৈশিষ্ট্য ও দৃঢ় প্রত্যয় একজন মানুষকে তখনই দেয়া হয় যখন সে ঐশী চাঁদরে আবৃত হয় এবং খোদার ছায়ায় পরিণত হয়, তারপর সে সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি ও তাদের কল্যাণ কামনায় নিজের মধ্যে একটি ব্যাকুলতা অনুভব করে। আমাদের প্রিয় নবী (সাঃ) এ বৈশিষ্ট্যে সব নবী আলাইহিমুস সালাম থেকে অগ্রগামী ছিলেন। তাই তাঁর (সাঃ) জন্য মানুষের দুঃখ-কষ্ট ছিল অসহনীয়। এ কারণে খোদা তা’আলা বলেন عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ অর্থাৎ এ রসূল তোমাদের দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে পারেন না। এটি তাঁর জন্য চরম অসহনীয় এবং তিনি তোমাদের বড় বড় কল্যাণের প্রত্যাশায় সদা ব্যাকুল থাকেন”। (আল্‌ হাকাম -৬ষ্ঠ খন্ড, ২৬ নাম্বার-পৃষ্ঠা: ৬, তারিখ ২রা জুলাই, ১৯০২)

পুনরায় তিনি (আঃ) বলেন,

“পবিত্র কুরআন আমাদের এ শিক্ষাই দেয় যে, নেক ও পূণ্যবান লোকদের ভালবাসো আর পাপাচারি ও কাফেরদের প্রতি সদয় হও। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন, عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ অর্থাৎ হে অবিশ্বাসীগণ! এ নবী এমন স্নেহশীল যে, যিনি তোমাদের দুঃখ সহ্য করতে পারেন না আর তোমরা যেন সেসব বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পাও এটিই তাঁর পরম চাওয়া।” (নূরুল কুরআন, নাম্বারঃ ২, রূহানী খাযায়েন ৯ম খন্ড পৃষ্ঠা: ৪৩৩)

অতএব আমরা জানলাম, কাফেরদের বিপদাপদ থেকে মুক্ত করার জন্যও তাঁর আকাংখা এত প্রবল ছিল যে, তারা ঈমান না আনায় তিনি (সাঃ) তাদের প্রতি সহানুভূতিতে নিজ প্রাণ বিনাশ করতে উদ্যত ছিলেন। অতএব তিনি হলেন সে-ই পরিপূর্ণ মানব যাঁর দৃষ্টান্ত অন্যত্র পাওয়া ভার।

অধুনাকালে পাশ্চাত্যের কোন না কোন দেশে প্রত্যহ ইসলাম এবং মহানবী (সাঃ)-এর বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে অপপ্রচার করে তাঁর (সাঃ) মর্যাদাহানীর অপচেষ্টা করা হয়। সম্প্রতি হল্যান্ডের একজন সাংসদ একটি বাজে কথা বলেছে; যাতে সে মহানবী (সাঃ), ইসলামী শিক্ষা আর পবিত্র কুরআন সম্পর্কে অত্যন্ত অশোভন ও স্বেচ্ছাচার মূলক মন্তব্য করেছে। যেখানেই ইসলাম এবং ইসলামের পবিত্র প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে এ ধরণের কটুক্তি করা হয় আল্লাহ্‌ তা’আলার ফযলে সেখানে, সে দেশে জামাতে আহ্‌মদীয়া তার উত্তর প্রদান করে থাকে। হল্যান্ড জামা'তকেও আমি বলেছিলাম, পত্র-পত্রিকায়ও লিখুন আর ইসলামের সুন্দর শিক্ষার চিত্র তাদের হৃদয়ে গেঁথে দিন যাতে করে সাধারণ মানুষের উপর এর যে নেতিবাচক প্রভাব আছে তা দূর করা যায়। প্রকৃতপক্ষে ইসলামই বর্তমান যুগে একমাত্র ধর্ম যা খোদার যৌক্তিক ��বং বাস্তব ধারণা উপস্থাপন করে। যদি এরা অজ্ঞানতা বা অল্প বিদ্যার কারণে ইসলাম এবং মহানবী (সাঃ) সম্পর্কে এ ধরণের নোংরা ও কদর্য কথাবার্তা বলে থাকে, তাহলে তাদেরকে ��সলামের অনুপম শিক���ষ��� কি আর জ���বনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মহানবী (সাঃ)-এর আদর্শ কিরূপ ছিল তা অবহিত করুন। তাদের চিন্তা-ভাবনাকে পরিস্কার করার জন্য তাদেরকে অবহিত করুন যে, খোদার সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতিতে তাঁর পবিত্র হৃদয় কতইনা পরিপূর্ণ ছিল। কিন্তু যদি তাদের হৃদয় কেবল ইর্ষা আর বিদ্বেষে পূর্ণ থাকে, কিছু শোনার জন্য প্রস্তুত না থাকে তাহলে কমপক্ষে আমাদের দায়িত্বতো পালন হবে। যাহোক, আজ এটি অনেক বড় একটি কাজ যা প্রত্যেক আহ্‌মদীকেই সম্পাদন করতে হবে।

হল্যান্ডের যে সাংসদের কথা আমি উল্ল্যেখ করেছি, তার যতটুকু সম্পর্ক আছে আমার মনে হয় এর হৃদয়ে ইসলাম, মহানবী (সাঃ), পবিত্র কুরআন ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা ও বিদ্বেষ রয়েছে। সম্প্রতি সে এক সাক্ষাৎকারে তা প্রকাশ করেছে। এ ব্যক্তির নাম Geert Wilders । ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম নিলেও রিপোর্ট অনুযায়ী ধর্মের সাথে এখন কোন বিশেষ সম্পর্ক নেই। এরা যেহেতু নিজ ধর্মে শান্তি খুঁজে পায় না, কিছু বুঝে আসেনা, খোদা পর্যন্ত পৌঁছার যোগ্যতা রাখেনা তাই ইসলামের বিরুদ্ধে ভালো-মন্দ বলা আরম্ভ করে, এর বিরুদ্ধে আপত্তি করতে শুরু করে। যাহোক, এ ব্যক্তি ইসলামের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিন থেকে আপত্তি করে আসছে। বোরখার বিরুদ্ধেও হল্যান্ডে সর্বপ্রথম যে আপত্তি উঠেছিল তাতেও সে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। বাহ্যতঃ বিধর্মী, কিন্তু ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের কারণে আপন খেয়ালে খৃষ্ট ও ইহুদী ধর্মকে ইসলাম থেকে উত্তম মনে করে। মনে করুক, কিন্তু যদি বিবেক থাকে তাহলে বর্তমান যুগে যখন পাশ্চাত্য দেশ সমূহের সভ্য হবার দাবী রয়েছে, আর এ ব্যক্তি নিজে শিক্ষিত হবার দাবী করে, সাংসদও বটে, এহেন পরিস্থিতিতে অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে অপালাপ করার তাদের কোন অধিকার নেই। কয়েকজনের ব্যক্তিগত কর্মের কারণে কুরআন আর মহানবী (সাঃ) সম্পর্কে তার এমন কথা বলার অধিকার নেই যা কোন বিবেকবান এবং শিক্ষিত মানুষ বলতে পারে না। উদাহরণ স্বরূপ মহানবী (সাঃ) সম্পর্কে বলেছে, যদি তিনি আজ হল্যান্ডে থাকতেন তাহলে নাউযুবিল্লাহ্‌ সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে তাঁকে দেশে থেকে বহিষ্কার করতাম। তুমি কি বের করবে! ইনশাআল্লাহ্‌ তুমি অচিরেই সে যুগ দেখবে যখন সর্বত্র সংখ্যাগরিষ্ট শ্রেণী মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর নাম উচ্চারণকারী হবে। মহানবী (সাঃ)-এর দাবীর সময় থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত হেন চেষ্টা নেই যা তাঁর বিরোধীরা করেনি। তারা কি সফল হয়েছে? আজ বিশ্বের সর্বত্র, প্রত্যেক দেশে, মুসলমানদের সংখ্যা কম হোক বা বেশি প্রত্যহ পাঁচ বেলা উচ্চস্বরে যদি কোন নবীর নাম উচ্চারিত হয়ে থাকে তাহলে তা কেবল এ রহ্‌মাতুল্লিল আলামীন এর নাম। যাঁর হৃদয় এ সব বিরোধীতা এবং বিরুদ্ধবাদীদের নীচ আচরণ সত্বেও সবার অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে সদা সহানুভূতির প্রেরণায় সমৃদ্ধ ছিল।

আবার বলে, কুরআনের শিক্ষা এমন যে এর অর্ধেক ছিড়ে ফেলে দেয়া উচিৎ, নাউযুবিল্লাহ। এ ব্যক্তিকে কেউ জিজ্ঞেস করুক, বাস্তবে তুমি বিধর্মী কিন্তু যে ধর্মকে ইসলাম থেকে উত্তম মনে কর, বিবেক খাটিয়ে পবিত্র কুরআনের শিক্ষার সাথে সে শিক্ষার তুলনা করে দেখ। হঠকারিতা মুক্ত হয়ে কুরআন শরীফ অধ্যয়ন করো তারপর বুঝতে না পারলে আমাদের কাছ থেকে বুঝে নাও কেননা অজ্ঞরা এ পবিত্র কালাম বুঝতে অক্ষম। পবিত্র কুরআনের দাবী হচ্ছে, প্রথমে নিজ হৃদয় ও মস্তিষ্ককে পবিত্র করো তাহলে এ পবিত্র শিক্ষা বুঝতে সক্ষম হবে নতুবা তোমাদের ন্যায় অজ্ঞতো পূর্বেও অনেক অতিবাহিত হয়েছে যারা প্রতিনিয়ত আপত্তি করে এসেছে। তাকেও আবুল হাকাম (জ্ঞানের পিতা) বলা হতো কিন্তু কুরআন না বুঝার কারণে আবু জাহ্‌ল আখ্যায়িত হয়েছে। আর সেসব হতদরিদ্র, শ্রমিক ও কৃতদাস যারা পৃথিবীর দৃষ্টিতে বিবেক ও অন্তর্দৃষ্টিহীন ছিলেন কিন্তু এ কুরআন বুঝার ফলে জ্ঞান ও তত্বজ্ঞানের প্রচারক স্বীকৃত হয়েছেন। তাই আমরা সকল প্রকার দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন করতঃ এ মমতাশীল ও দয়ালু নবীর বরাতে তোমার মনযোগ আকর্ষণ করছি, তিনি তোমাদের মত লোকদেরকেও আগুনের আযাব থেকে রক্ষা করার জন্য ব্যাকুল থাকতেন। গভীর অভিনিবেশ ও মনযোগ সহকারে তাঁর বাণী পড় আর দেখো, যাচাই করো, বুঝার চেষ্টা করো আর বুঝতে না পারলে আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করো এবং নিজেদেরকে সে-ই যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে রক্ষা করো যা আল্লাহ্‌ তা’আলা সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। এ ধরণের কথা যারা বলছে আল্লাহ্‌ তাদেরকে বিবেক বুদ্ধি খাটানোর এবং বুঝার শক্তি দিন।

কিন্তু এ পরম মমতাশীল ও দয়ালু নবীর জীবনের প্রতিটি সুন্দর মূহুর্তের চিত্র এদের কাছে পৌঁছানও আহ্‌মদীদের একটি অনেক বড় দায়িত্ব। এরা বলে, তিনি (সাঃ) নাকি সন্ত্রাসের শিক্ষা প্রদান করেছেন অথচ তাঁকে আল্লাহ্‌ তা’আলা রউফ ও রহীম মনোনীত করেছিলেন। ইসলামী যুদ্ধে মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধদের সাথে কেমন সদয়, অনুগ্রহপূর্ণ আর দয়াসূলভ আচরণের শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে, যুদ্ধ বন্দীদের সাথে কিরূপ দয়ার শিক্ষা রয়েছে তা তাদেরকে বলুন? এমন যুদ্ধবন্দী যারা কেবল মুসলমানদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধে অংশ নিত; তাদের প্রতি স্নেহ ও দয়ার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। নিজেরা ক্ষুধার্ত থেকে অথবা অল্প-স্বল্প খেয়ে তাদের পেটপুরে খাওয়ানো হত। জাপানের দু’টি শহরে পারমানবিক বোমা নিক্ষেপ করে সেখানকার গোটা জনবসতিকে পুড়িয়ে ভষ্মীভূত করেছিল, শিশু, বৃদ্ধ, মহিলা, রোগী সবাই চোখের নিমেষে ভষ্মস্তুপে পরিণত হয়েছিল বরং আশেপাশের এলাকায় বসবাসকারীরাও এরফলে বছরের পর বছর বরং এখনও অনেক কঠিণ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নতুন জন্মগ্রহণকারী শিশুরা বিকলাঙ্গ জন্ম নিচ্ছে। আজকে সে মূর্তিমান স্নেহ-মমতাশীলের উপর এ অপবাদ আরোপকারীরা বলুক, এটিই কি উত্তম আদর্শ? যারা এ ন্যাক্কারজনক পরিণতির জন্য দায়ী তাদেরকে এরা শান্তিপ্রিয় ও শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী আখ্যায়িত করে থাকে। ইরাকে যা কিছু ঘটছে এরা তাকে কি অভিহিত করবে। স্মরণ রেখ! এসব অন্যায় সত্ত্বেও ইসলামের খোদা, তাঁর প্রিয় নবী যিনি সবার জন্য মমতাশীল এবং দয়ালু ছিলেন, তাঁর উপর যে শিক্ষা অবতীর্ণ করেছেন, যা পবিত্র কুরআন আকারে আমাদের হাতে রয়েছে তা এত সুন্দর শিক্ষা; যদি বুঝার ইচ্ছা থাকে তাহলে তারা বুঝতে পারবে।

আমি একটি আয়াত উল্ল্যেখ করছি। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন, তিনি এরূপ পাপাচারিকেও ক্ষমার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। তিনি বলেন,

إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلاً صَالِحاً فَأُولَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُوراً رَحِيماً

সে ব্যক্তি ব্যতীত যে তওবা করে এবং ঈমান আনে আর পূণ্যকর্ম করে; এরা এমন লোক যে, আল্লাহ্‌ তাদের মন্দ কর্মসমূহকে সুন্দর কর্মে পরিবর্তিত করবেন; বস্তুতঃ আল্লাহ্‌ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়। (আল্‌ ফুরকানঃ ৭১)

অতএব উক্ত নির্দেশনার আলোকে এদেরকে নিজের চরকায় তেল দেয়া উচিত। মুসলমানদের মনে কষ্ট দেয়ার পরিবর্তে নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিৎ। তাদের নিজেদের মাঝে কতটুকু পূণ্য রয়েছে? আল্লাহ্‌ তা’আলার প্রিয়ভাজনদের অপমান করার পরিবর্তে নিজেদের হৃদয়ে উঁকি মেরে দেখা উচিৎ। আজ পাশ্চাত্যে যে অগণিত নোংরামি ছড়িয়ে আছে তা আত্মবিশ্লেষণ না করার ফলে হচ্ছে। তোমাদের ঘরের সুখ-শান্তি যে বিনষ্ট হয়েছে তা খোদার সমীপে তওবাহ্‌ না করার কারণে। আল্লাহ্‌ তা’আলা সুযোগ দিয়েছেন এখনও সময় আছে, নিজেদের খোদাকে চিন আর তাঁর প্রিয়দের সম্পর্কে অপালাপ থেকে বিরত হও এবং রহীম খোদার কাছে ক্ষমার মিনতি কর।

আমি পুনরায় আহ্‌মদীদের বলছি, ইসলামী শিক্ষা শিরোধার্য করতঃ এ বিবেকহীন বা নিদেনপক্ষে তাদেরকে যারা এদের প্রভাবাধীন, যারা খোদার প্রিয়ভাজনদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টাকে কিছু ��নে করে���া, তাদেরকে বুঝান, যদি তোমরা বিরত না হও তাহলে তোমরাও থাকবেনা আর তোমাদের দেশেরও কোন স্থায়ীত্বও নেই, এর কোন নিশ্চয়তা নেই। যদি নিজ অস্তিত্বের নিশ্চয়তা চাও তাহলে এ মানবদরদী আর আল্লাহ্‌ তা’আলার প্রিয় নবী (সাঃ)-এর উপর আক্রমন বন্ধ করো। তাঁর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করো। সম্পর্ক না রাখলেও নিদেনপক্ষে ভদ্রতার খাতিরে চুপ থাকো।

যুদ্ধ বিগ্রহ ছাড়া আবহাওয়াগত পরিবর্তনের কারণেও বর্তমানে বিশ্ব ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। হল্যান্ডতো সে-ই দেশ যেখানে এ দৃষ্টিকোণ থেকেও শিরক্‌ সীমাতিরিক্ত; যেমন এখানে কেউ কেউ বলেন, পুরো বিশ্ব খোদা বানিয়েছেন কিন্তু হল্যান্ড আমরা বানিয়েছি। সমুদ্র থেকে কিছু জমি ছিনিয়ে এদের অহংকার বেড়ে গেছে। একথা বুঝেনা যে, এখনও দেশের অধিকাংশ সমূদ্র পৃষ্ঠের নীচে। যখন বন্যা হয়, দুর্যোগ দেখা দেয়, আল্লাহ্‌ তা’আলার আযাব আসে তখন তা পাহাড়কে নিমজ্জিত করে। তাই এদেরকে এবং বিশ্বের সর্বত্র বসবাসকারী মানুষকে এ দৃষ্টিকোণ থেকে খোদা তা’আলার নিকটতর করার দায়িত্ব আহ্‌মদীদের। নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হোন আর নিজেরা এ নবী (সাঃ)-এর আদর্শে পরিচালিত হয়ে দয়ার প্রেরণা নিয়ে মানবতাকে বাঁচানোর চিন্তা করুন। বিশ্বকে এক খোদার সাথে পরিচিত করান; কেননা আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেছেন, তওবাকারী ও বিশ্বাসী আর ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে সৎকর্মশীলরাই ক্ষমা পেতে পারে।

তাই এ বাণীকে সর্বত্র পৌঁছে দিন, নতুবা যেভাবে আমি পূর্বেও বলেছি, বিশ্ব খোদার প্রিয়পাত্রের উপর অন্যায় আক্রমন করে শাস্তিকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। এ যুগে হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) তাঁর সত্যতার নিদর্শন হিসেবে জমিন এবং আসমান থেকে আগত দুর্যোগের সংবাদ দিয়েছেন। তাই অত্যন্ত ভয়ের ব্যাপার আর বিশ্বকে জোরালোভাবে সতর্ক করা প্রয়োজন। মহানবী (সাঃ)-এর মর্যাদা তাদের সম্মুখে সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন। সে জ্যোতিকে দেখানো প্রয়োজন, যিনি নিরক্ষর আর অজ্ঞ আরবদের সেযুগে সুসভ্য ও খোদা প্রেমিক জাতিতে পরিণত করেছিলেন।

হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ) বলেন,

“বধিরদের শ্রবণশক্তি প্রদানের জন্য পৃথিবীতে এক রসূল এসেছেন, তারা যে কেবল আজই বধির এমন নয় বরং শত-শত বছর ধরেই বধির। কে অন্ধ এবং কে বধির? সে, যে তৌহিদ বা একত্ববাদকে গ্রহণ করেনি আর সে রসূলকেও গ্রহণ করেনি যিনি নুতনভাবে পৃথিবীতে তৌহিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। সে রসূল যিনি বন্যদের মানুষ বানিয়েছেন, এবং মানুষকে চরিত্রবান মানুষে অর্থাৎ সত্য ও বাস্তব চারিত্রীক গুণাবলীর ক্ষেত্রে পুরো ভারসাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারপর নৈতিক গুণাবলী সমৃদ্ধ মানুষকে খোদাপ্রাপ্ত মানুষে উন্নীত করে ঐশী রঙে রঙ্গীন করেছেন। সে রসুল, হ্যাঁ সত্যের সে সূর্য যাঁর সাহচর্যে সহস্র-সহস্র মৃত পুনঃজীবন লাভ করে; যারা শির্‌ক, নাস্তিকতা, অনাচার ও কদাচারপূর্ণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। এভাবে কার্যতঃ কিয়ামতের নমুনা প্রদর্শিত হয়েছে। যীশুর কথার ন্যায় কেবল বড় বড় বুলি নয় বরং তিনি মক্কায় আবির্ভূত হয়ে পৌত্তলিকতা ও মানব পূজার মত অনেক অন্ধকারকে দূরীভূত করেছেন; আসলে পৃথিবীর প্রকৃত জ্যোতি তিনিই ছিলেন; তিনি বিশ্বকে অন্ধকারে পেয়ে একে এমন আলো দান করেছেন যে, অন্ধকার রাত্রিকে আলোকোজ্জল দিবসে বদলে দিয়েছেন। তাঁর আগমনের পূর্বে পৃথিবী কিরূপ ছিল এবং তাঁর আগমনের পরে পৃথিবীর অবস্থা কিরূপ হয়েছে? এটি এমন কোন প্রশ্ন নয় যার উত্তর প্রদান কষ্টসাধ্য। যদি আমরা ঈমানশুন্য না হই তাহলে আমাদের বিবেক অবশ্যই আমাদেরকে একথা মানতে বাধ্য করবে যে, সে সুমহান পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত রসুল (সাঃ)-এর আগমনের পূর্বে প্রত্যেক দেশের মানুষ খোদা তা’আলার মহিমা ভুলে বসেছিল আর সে সত্য উপাস্যের প্রাপ্য সম্মান দেয়া হয়েছে অবতার, পাথর, নক্ষত্র, বৃক্ষ, জীবজন্তু ও মরণশীল মানবকে এবং তুচ্ছ সৃষ্টিকেই বসিয়েছিল সে প্রতাপশালী ও পবিত্র সত্বার আসনে। আর এটিই যদি সত্যি হয় যে, এসব মানুষ, জন্তু, নক্ষত্ররাজি, বৃক্ষ প্রভৃতি আসলে খোদাই ছিল, যীশুও যাদের একজন; তাহলে এ রসূলের কোন প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু যদি এ সব বস্তু খোদা না হয়ে থাকে তাহলে মক্কার পাহাড়ে সৈয়দনা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম যে দাবী করেছিলেন অবশ্যই সে দাবীর মাঝে এক অসাধারণ জ্যোতি ছিল? সে দাবী এ উক্তি ছাড়া আর কিছুই নয় যে, খোদা তা’আলা বিশ্বকে শির্‌কের ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত পেয়ে সে অন্ধকাররাশীকে দূরীভূত করার জন্য আমাকে প্রেরণ করেছেন। এটি যে শুধু মাত্র একটা দাবীই ছিল তা নয়, বরং সে রসূলে মকবুল (সাঃ) এ দাবীকে সত্য প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। যদি কোন নবীর শ্রেষ্ঠত্ব, নবীর সে কর্মের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, যে কর্মে মানবজাতির প্রতি তাঁর সত্যিকার ভালবাসা সব নবীর চেয়ে অধিক প্রমাণিত হয় তাহলে হে লোকসকল! উঠ এবং সাক্ষ্য প্রদান করো যে, এক্ষেত্রে পৃথিবীর বুকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের কোন দৃষ্টান্ত নেই।............সৃষ্টির অন্ধ পূজারীরা সে মহান নবী (সাঃ) কে চিনতে পারেনি, যিনি সত্য সহানুভূতির সহস্র-সহস্র দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেখিয়েছেন। কিন্তু আজ আমি দেখতে পাচ্ছি, সে সময় এসে গেছে যখন এ রসূলকে (সাঃ) পুনরায় সনাক্ত করা হবে। তোমরা চাইলে আমার এ কথা লিখে রাখতে পারো, এখন থেকে মৃতের উপাসনা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে পেতে অবশেষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। মানুষ কি খোদার সাথে প্রতিদ্বন্দিতা করবে? তুচ্ছ বিন্দু কি খোদার পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিবে? মরণশীল আদম সন্তানের ষড়যন্ত্র ঐশী ইচ্ছাকে ব্যর্থ করতে পারে কি? হে যারা শুনতে চাও শুনে রাখ! এবং হে যারা চিন্তা করতে সক্ষম তারা ভেবে দেখ! এবং স্মরণ রেখ যে, সত্য প্রকাশিত হবেই এবং এবং সত্য জ্যোতির আলো বিচ্ছুরিত হবেই।” (তবলীগে রিসালত, ৬ষ্ট খন্ড-পৃষ্ঠা: ৯)

সুতরাং এ বাণী, একত্ববাদের বাণী যা আমাদেরকে আজ এমন সবার কাছে পৌঁছাতে হবে যারা বিবেকবান ও শালীন। এ কাজের জন্য আমাদেরকে পূর্বের তুলনায় অধিক সোচ্চার হতে হবে। আল্লাহ্‌ তা’আলার এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। আর আমরা সদা এটি প্রত্যক্ষ করি এবং করছি। এটি আমাদের সামান্য প্রচেষ্টা যা আমাদেরকে পূণ্যের ভাগী করবে।

পরিশেষে পুনরায় আমি এ বাগাড়ম্বরদের যারা মহানবী (সাঃ) সম্পর্কে অশালীন কথা বলে, তাদের কাছে আমি হযরত মসীহ্‌ মওউদ (আঃ)-এর বাণী পৌঁছাতে চাচ্ছি। তিনি (আঃ) বলেন,

“মুসলমান সে জাতী যারা নিজেদের সম্মানিত নবী (সাঃ)-এর সম্মানের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়ে থাকে, আর তারা এরূপ লোকদের সাথে মিমাংসা ও বন্ধুত্ব করার মত ন্যাক্কারজনক কাজের পরিবর্তে মৃত্যূকে শ্রেয় মনে করে, দিবারাত্র যাদের কাজ হচ্ছে, রসূল (সাঃ)-কে গালি-গালাজ করা আর নিজেদের পত্র-পত্রিকা, বই-পুস্তক আর বিজ্ঞাপনাদীতে চরম অপমানজনকভাবে তাঁর উল্ল্যেখ করা এবং জঘন্য নোংরা ভাষায় তাঁকে স্মরণ করা। আপনারা স্মরণ রাখুন! এরা স্বজাতিরও শুভাকাঙ্খী নয়। কেননা এরা তাদের পথে কাঁটা বিছিয়ে থাকে। আমি সত্য সত্যই বলছি যে, আমরা জঙ্গলের সাপ আর মরুভুমির হিংস্র জন্তুর সাথে সন্ধি করতে পারি কিন্তু যারা খোদার পবিত্র নবীদের অবমাননা থেকে বিরত হয় না আমরা এরূপ লোকদের সাথে সন্ধি করতে পারি না। তারা মনে করে যে, গালি আর কটুক্তির মধ্যেই বিজয় নিহিত; কিন্তু প্রতিটি বিজয় আকাশ হতে অবতীর্ণ হয়।” (লাহোর জলসায় পঠিত প্রবন্ধ, চশমায়ে মা’রেফাত, পৃষ���ঠা: ১৪)

ইনশাআল্লাহ্‌ তা’আলা সে বিজয়তো আসবেই। প্রত্যেক আহ্‌মদী উক্ত সংবাদ এরূপ লোকদের এবং অন্যান্য দেশবাসীর কাছেও পৌঁছান যে, যারা এ ধরণের কথাবার্তা বলে তারা না তোমাদের শুভাকাঙ্খী আর না দেশের কল্যাণকামী। এরা বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তাকামী নয় বরং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী আর তাদেরর উদ্দেশ্য কেবলমাত্র বিশ্বে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা। আল্লাহ্‌ তা’আলা বিশ্বকে সকল অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন।

প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে