In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.
Love for All, Hatred for None.
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ
সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই:)
বাইতুল ফুতুহ্ মস্জিদ, লন্ডন, ইউকে
২রা অক্টোবর, ২০০৮ইং
أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*
بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)
উচ্চারণ: আশহাদু আন্ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্ যোয়াল্লীন। (আমীন)
হুযূর বলেন, আল্লাহ্ তা’লার অপার অনুগ্রহে আজ আমরা ঈদ উদ্যাপন করছি, যাকে ইসলামী পরিভাষায় ঈদুল ফিতর বলা হয়ে থাকে। ঈদ শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, এমন উৎসব যা বারবার ফিরে আসে। ইসলাম ধর্মে এ ধরনের দু’টি উৎসব রয়েছে। একটি ঈদুল ফিতর অপরটি ঈদুল আয্হা। ঈদুল ফিতর রমযানের শেষে আসে যেদিন পানাহারে কোন বাঁধা থাকে না আর ঈদুল আযহা মূলতঃ কুরবানীর সাথে সম্পর্ক রাখে। হাদীসে এসেছে যে, এটি পানাহার এবং আনন্দ-উল্লাসের দিন। সচরাচর আনন্দ ও খুশীর মুহুর্তের জন্য ঈদ শব্দ ব্যবহার হয়। বছরের দু’টি ঈদ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে, তুমি খোদার নির্দেশ পালনার্থে যে ত্যাগ ও তিতিক্ষা করেছো তার ফলে আজ তোমাকে আনন্দ উদ্যাপনের স্বাধীনতা দেয়া হচ্ছে। তাই এই ঈদ মূলতঃ খোদার নির্দেশ এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্যই অনুষ্ঠিত হয়। পবিত্র কুরআনে যে প্রসঙ্গে ঈদ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা মুসলমানদের জন্য নয় বরং খৃস্টানদের বরাতে বর্ণিত হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে,
قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنْزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِأَوَّلِنَا وَآَخِرِنَا
{ক্বালা ঈসাবনু মারইয়ামা আল্লাহুম্মা রব্বানা আনযিল আলাইনা মাইদাতাম মিনাস সামায়ে তা’কুনুলানা ঈদাল্লি আউয়ালিনা ওয়া আখিরিনা}
অর্থ: মরিয়মের পুত্র ঈসা বললো, হে আল্লাহ্ আমাদের প্রভু! তুমি আকাশ হতে আমাদের জন্য খাদ্য ভরতি খাঞ্চা নাযেল করো যেন তা আমাদের প্রথমাংশ এবং শেষাংশের জন্য ঈদ স্বরূপ হয়।’ (সূরা আল্ মায়েদা: ১১৫)
মুসলমানদের জন্য ঈদ শব্দ যে অর্থে ব্যবহৃত হয় এটি তাত্থেকে ভিন্ন অর্থ। খৃস্টানদের এই ঈদ আল্লাহ্র পক্ষ থেকে কোন কুরবানীর ফলে নাযেল হয়নি। আপনারা যদি সূরা মায়েদায় বর্ণিত পুরো বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেন তাহলে দেখবেন যে, প্রার্থনা মোতাবেক আল্লাহ্ উভয় যুগের জন্যই রিয্কের ব্যবস্থা করেছেন আর পাশাপাশি সাবধান করে বলেছেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞ না হও তাহলে শাস্তি পাবে। অদৃশ্যের বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত আল্লাহ্ জানতেন যে, এরা এক সময় গিয়ে অকৃতজ্ঞ হবে তাই কঠোর শাস্তি সম্পর্কেও হুঁশিয়ারি প্রদান করেছেন। বর্তমানে আমরা দেখছি যে, খৃষ্ট জগত কিভাবে এই রিয্ক অপচয় করছে বা রিয্কের অন্যায় ব্যবহার হচ্ছে। এ কারণেই আল্লাহ্ তা’লা ভয়াবহ শাস্তির সংবাদ দিয়েছেন। সুতরাং একজন মু’মিন এমন ঈদের আকাংখা করতেই পারেন না আর আল্লাহ্ও এমন ঈদ সম্পর্কে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের নির্দেশ দেন নি বরং এই ঈদ থেকে বাঁচার জন্য সূরা ফাতিহাতে غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ এর দোয়া শিখিয়েছেন। এই দোয়া আমরা প্রত্যেক নামাযের প্রতিটি রাকাতে পাঠ করে থাকি। মু’মিনের ঈদ হচ্ছে তা যারা ঘুরে ফিরে বারবার আসে আর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। একজন মু’মিনের জন্য সত্যিকার ঈদ হচ্ছে খোদার নিয়ামতপ্রাপ্তী। আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূলের আনুগত্যের মাধ্যমেই এই নিয়ামত লাভ হয়। আর এই আনুগত্যের ফলে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (আ:) খোদার কাছ থেকে পরম পুরস্কার লাভ করেছেন। মহানবী (সা:)-এর পূর্ণ আনুগত্য ও দাসত্বের ফলে আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে নবীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে মসীহ্ ও মাহদীরূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত করেছেন। এর পরের পদমর্যাদাও একজন মু’মিন আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূলের আনুগত্যের ফলেই লাভ করে। সুতরাং এই নিয়ামত একজন আহ্মদীকে অন্যদের তুলনায় সতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করে।
আল্লাহ্ তা’লা কেবল খৃস্টানদেরকেই সতর্ক করেন নি বরং সেসব মুসলমানও এতে সম্বোধিত যারা যুগ ইমামকে অস্বীকার করেছে, কারণ তারা মনে করে, মহানবী (সা:)-এর আনুগত্য করেও নবুওতের মর্যাদা লাভ করা সম্ভব নয় অথচ আল্লাহ্ তা’লা পবিত্র কুরআনে বলেন,
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقًا
{ওয়া মাইঁইউতি’য়িল্লাহা ওর্য়ারাসূলা ফাউলাইকা মা’য়াল্লাযীনা আন’য়ামাল্লাহু আলাইহীম মিনান্নাবীঈনা ওয়াস্সিদ্দিক্বীনা ওয়াশ্শুহাদায়ে ওয়ছছালেহীনা ওয়া হাসুনা উলাইকা রফীক্বা}
অর্থ: ‘এবং যারা আল্লাহ্ এবং এই রসূলের আনুগত্য করবে তারা ঐসব লোকদের অন্তর্ভূক্ত হবে যাদেরকে আল্লাহ্ পুরস্কার দিয়েছেন অর্থাৎ নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সালেহদের মধ্যে। এবং এরাই সঙ্গী হিসেবে উত্তম।’ (সূরা আন্ নিসা: ৭০)
হুযূর বলেন, খোদার জন্য ত্যাগ স্বীকার করা এবং তাঁর রসূলের পূর্ণ আনুগত্য করার পরও যারা কোনই পুরস্কার পায় না তাদের আবার ঈদ কিসের? আজ সত্যিকারের ঈদ কেবল আহ্মদীদের জন্যই। যারা মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে মেনে সেসব নিয়ামতের প্রত্যাশা রাখে যা আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের আনুগত্যে লাভ হয়। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:) এর ব্যাখ্যায় বলেন,
‘আমরা নামাযে এই দোয়া করি যে, اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ এর অর্থ হলো, আমরা আল্লাহ্ তা’লার কাছে আমাদের ঈমানের উন্নতি এবং মানব জাতির কল্যাণের জন্য চার প্রকারের নিদর্শন যা চারটি উৎকৃষ্ট পুরস্কার হিসেবে লাভের প্রত্যাশা রাখি। অর্থাৎ, নবী, স��দ্দিক, শহীদ এবং সালেহ্’র উৎকর্ষতায় পৌঁছানোর আকাংখা রাখি’।
তিনি (আ:) বলেন,
নবীর অনুপম বৈশিষ্ট্য হলো: ‘আল্লাহ্র কাছ থেকে এমন অদৃশ্যের জ্ঞান ��াভ যা নিদর্শন স্বরূপ হয়ে থাকে।’ অর্থাৎ, খোদা তা’লা অবারিতভাবে তাদের সাথে বাক্যালাপ করেন। তিনি তাদেরকে ভবিষ্যতের গুপ্ত রহস্য অবহিত করবেন।’
তিনি (আ:) বলেন,
‘সিদ্দিকের বৈশিষ্ট্য হলো: সত্যবাদিতা ও নিষ্ঠায় তাঁর এতটা দখল থাকবে অর্থাৎ আল্লাহ্র কিতাবের সত্য ও গুপ্ত রহস্যাবলী সম্পর্কে তিনি এমনভাবে অবহিত হবেন যে, অলৌকিক হবার কারণে তা নিদর্শন বিবেচিত হয়। ঐশী গ্রন্থের জ্ঞান এবং গ্রন্থে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতি তাঁর পূর্ণ ঈমানও আবশ্যক। আল্লাহ্র তৌহিদের সূক্ষ্মতত্ব তিনি বুঝবেন আর আনুগত্য কাকে বলে তাও তিনি জানবেন। খোদার ভালবাসার জ্ঞান তিনি রাখবেন এবং শির্ক থেকে মুক্তির উপায়ও তিনি অবগত থাকবেন। খোদার দাসত্বের স্বরূপ কি আর আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা কাকে বলে তাও তাঁর জানা থাকবে। খোদা ভীরুতা, খোদার সন্তুষ্টি এবং খোদার সত্ত্বায় বিলীন হওয়া, বিশ্বস্ততা, বিনয়, দানশীলতা, আকুতি-মিনতি, দোয়া, মার্জনা, লজ্জাবোধ, আমানত রক্ষা করা, খোদার উপর ভরসা করার মত উন্নত নৈতিক গুণাবলীর স্বরূপ এবং এর বাস্তব জ্ঞান ও এর উপর তাঁকে প্রতিষ্ঠিত থাকতে হয়। এছাড়া নিজের দুবর্লতা ও অযোগ্যতার উপর যখন তাঁর দৃষ্টি পড়ে তখন তিনি ইয়্যাকানা’বুদু বলেন আর নিষ্ঠার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে মিথ্যাকে পরিত্যাগ করেন, সকল প্রকার নোংরামি এবং অপবিত্রতা যা মিথ্যার সাথে সংশ্লিষ্ট তা থেকে মুক্ত থাকেন এবং কখনো মিথ্যা না বলার অঙ্গীকার করেন। এ অঙ্গীকার করেন যে, কখনো মিথ্যা সাক্ষ্য দিবেন না, প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে কখনো মিথ্যা কথা বলবেন না, অযথাও মিথ্যা বলবেন না আর কোন লোভের বশবর্তী হয়েও মিথ্যা বলবেন না, কোন ক্ষতি থেকে রেহাই পাবার জন্যও মিথ্যা বলবেন না অর্থাৎ কোনভাবেই কোন ক্রমে মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না। যদি এই অঙ্গীকারের উপর প্রতিষ্ঠিত হন তাহলে তিনি ইয়্যাকানা’বুদু’র উপর সত্যিকারেই প্রতিষ্ঠিত। এ কাজ হচ্ছে উন্নত পর্যায়ের ইবাদত আর এটিই সিদ্দিকের সংজ্ঞা।’
তিনি (আ:) আরো বলেন,
‘শহীদের বৈশিষ্ট্য হলো, সমস্যা, দু:খ-কষ্ট এবং পরীক্ষার সময় এমন ঈমানী দৃঢ়তা ও উন্নত নৈতিকতা প্রদর্শন করা যা অলৌকিক হবার কারণে নিদর্শন হয়ে থাকে। ঈমান যত দৃঢ় থাকে আমলও ততটা দৃঢ় হয়। উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে এমন ঈমানী শক্তি এক পর্যায়ে তাঁকে শহীদের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। ঈমানের অবস্থা এমন পর্যায়ে উপনীত হলে তিনি সবকিছু কুরবানী করতে পারেন এমনকি প্রাণ বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করেন না।’
এরপর তিনি (আ:) বলেন,
‘সালেহীন বা পুণ্যবান তারা যাদের ভেতর থেকে সকল প্রকার বিশৃংখলা এবং ব্যাধি দূরীভূত হয়। মানুষ যখন আরোগ্য লাভ করে তখন যেভাবে খাবারের স্বাদ পেতে আরম্ভ করে অনুরূপভাবে পুণ্যবানদের মধ্যে কোনরূপ আধ্যাত্মিক ব্যাধি থাকে না আর ফাসাদ বা বিশৃংখলা বলতেও কিছু অবশিষ্ট থাকে না। মানুষ যখন নিজের নফস বা প্রবৃত্তিকে দমন করে তখনই এর পরাকাষ্ঠা দেখা যায়। সুতরাং সালেহ্ হবার জন্য আত্ম সংশোধনের চেষ্টা করা একান্ত আবশ্যক।’
হুযূর বলেন, মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর উদ্ধৃতির আলোকে আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রেরণা পাই কেননা, খোদা তা’লা আপন অনুগ্রহে আজ আমাদেরকে এমন জামাতে অন্তর্ভূক্ত করেছেন যারা পবিত্র কুরআনের সঠিক জ্ঞান ও মর্মার্থ অনুধাবন করতে সক্ষম। এর পাশাপাশি আমাদের সেসব দায়িত্বের প্রতিও দৃষ্টি নিবদ্ধ হওয়া উচিৎ যা একজন আহ্মদীর কাছে কাম্য। যদি কোন মানুষ অন্ধকার কক্ষে বাস করে তাহলে সে বলতে পারে যে, আলো দেখিনি কিন্তু যার জন্য আলোর ব্যবস্থা আছে সে যদি না দেখে তাহলে এর জন্য অন্য কেউ নয় বরং সে-ই দায়ী।
হুযূর বলেন, পবিত্র রমযান মাসে আপনারা ইবাদত বন্দেগী করেছেন, পবিত্র কুরআন পাঠ করেছেন, সাধ্যমতো কুরআনের দরস শুনেছেন এবং কুরআনের শিক্ষার প্রতি অভিনিবেশেরও সুযোগ হয়েছে। মন্দ প্রবৃত্তিকে দমন করে উন্নত নৈতিক গুণাবলী অবলম্বনের চেষ্টা করেছেন। বাস্তবিকপক্ষে এসব উত্তম অভ্যাসগুলো ধরে রাখা এবং এর উপর আমলই খোদা ও তাঁর রসূলের আনুগত্য। রমযানে খোদার নির্দেশ মানতে গিয়ে সকল প্রকার বৈধ জিনিষ পরিত্যাগ করা আর তাঁর ভালবাসা ও নৈকট্য লাভের বাসানায় রাত জাগার পুরস্কার স্বরূপ প্রদেয় একটি বাহ্যিক আনন্দের নাম হচ্ছে ঈদ। খোদার খাতিরে কৃত কুরবানীর প্রতিদান স্বরূপ এই ঈদ আয়োজন। এর ধারা অফুরন্ত এবং অশেষ। ঈদের এই আনন্দ বিশ্বের কোন শক্তিই আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আল্লাহ্র জন্য কষ্ট ও সমস্যায় পতিত হলে খোদা এভাবেই তার উত্তম প্রতিদান দিয়ে থাকেন। খোদার রহমত সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। খোদা তা’লা বলেন,
مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَى إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
{মান জাআ বিলহাসানাতি ফালাহু আশরু আমছালিহা ওয়া মান জাআ বিস্সাইয়্যিআতি ফালা ইউজ্যা ইল্লা মিছলাহা ওয়া হুম লা ইউযলামুন}
অর্থ: ‘যে কেউ সৎকর্ম করবে সে এর জন্য দশগুণ পুরষ্কার পাবে এবং যে কেউ মন্দ কর্ম করবে তাকে কেবল তার অনুরূপ প্রতিফল দেয়া হবে, এবং তাদের উপর কোন অবিচার করা হবে না।’ (সূরা আল্ আন্’আম: ১৬১)
হুযূর বলেন, ইনি হলেন আমাদের খোদা যিনি সর্বদা তাঁর বান্দাদেরকে আপন অনুগ্রহে ভূষিত করেন। তিনি তাঁর বান্দার প্রতি বড়ই দয়ালু। তিনি বান্দার প্রতিটি তুচ্ছাতিতুচ্ছ কর্মেরও প্রতিদান দেন আর পুণ্য কর্মের পুরস্কারতো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়ে থাকেন। আমরা রমযানে তাঁর নির্দেশ মেনে ত্রিশ’টি রোযা রেখেছি হাদীস অনুসারে এরফলে তিন’শ দিনের সওয়াব দিবেন আর যারা শওয়ালের ছয় রোযা রাখবেন তাদেরকে ছত্রিশ দিনের হিসেবে পুরো বছরের রোযা রাখার সওয়াব দিবেন। ইনি আমাদের খোদা যিনি বান্দার কাছে কোন ত্যাগ চাইলে তার প্রতিদান কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেন। ত্রিশ দিন রোযার শেষে আমাদেরকে ঈদ দিয়েছেন আর এদিনে পানাহার ও আনন্দ-উচ্ছ্বাস করার সুযোগ দিয়েছেন। ঈদের দিনে আনন্দ করার পাশাপাশি আমাদের খোদার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাও আবশ্যক আর ঈদের নামায হচ্ছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রথম ধাপ। তিনি যদি আমাদেরকে কষ্টে নিপতিত করেন তাহলে এর বিনিময়ে উত্তম প্রতিদানও দেন। খোদার জন্য কেউ ত্যাগ স্বীকার করলে খোদা স্বয়ং তার জন্য স্বাচ্ছন্দের বিধান করেন। ধর্মের খাতিরে কৃত কোন ত্যাগই প্রতিদান বিহীন থাকে না। আমরা যুগ মসীহ্কে মেনেছি আর তাঁকে মানার কারণে অন্যদের রোষানলে পড়ে ধন-সম্পদ, মান-ইজ্জত, প্রাণ ও সন্তান-সন্ততির কুরবানী করছি। আমাদের এই কুরবানী বৃথা যাবে না। আল্লাহ্ তা’লা বলেন,
إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا.
{ইন্না মা’য়াল্ উসরে ইউসরা। ফাইন্না মা’য়াল্ উসরে ইউসরা}
অর্থ: ‘নিশ্চয় কষ্ট-কাঠিন্যের সাথে সহজসাধ্যতা রয়েছে। হ্যাঁ অবশ্যই কষ্ট-কাঠিন্যের সাথে সজসাধ্যতা রয়েছে।’ (সূরা আল্ ইনশেরাহ্: ৬-৭)
এ আয়াত আমাদেরকে সংবাদ দিচ্ছে যে, তোমাদের এই দু:খ-দুর্দশার সময় স্থায়ী নয় বরং এরপরে তোমাদের জন্য খোদার পক্ষ থেকে স্বাচ্ছন্দের বিধান হবে এবং তোমরা খোদার অশেষ দানে ভূষিত হবে। আল্লাহ্র দানের ধারা অনন্ত। যারা অ-আহ্মদী তারা নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সালেহ্ হতে পারে বলে বিশ্বাস করে না। তারা খোদার অনন্ত নিয়ামতের দ্বার রুদ্ধ করে দিতে চায়। এরা কখনো নাসেখ-মনসূখ আবার কখনো ঈসার মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ পোষণ ছাড়াও অন্যান্য ��িতন্ডায় লিপ্ত। পীর পূজা করে। এরা প্রয়োজনে মিথা বলা বৈধ মনে করে; তাদের সিদ্দিকিয়াতের সাথে কি সম্পর্ক আর তাদের সত্যবাদী হবার প্রয়োজনই বা-কি? যারা অন্যকে হত্যা করা পুণ্যের কা��� বলে মনে করে আর অত্যাচারীর হাতকে শক্তিশালী করে তারা কিভাবে ঈমানে উন্নতি করতে পারে। আমাদের প্রিয় নবী (সা:) তাঁর বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে বলেছেন, ‘মানুষের প্রাণ, সম্পদ ও সম্মানকে পদদলিত করা কোন ভাবেই বৈধ নয়’। অথচ আজ এরা খোদা এবং সেই অসীম দয়ালু নবীর নামে জঘন্য অপকর্ম করছে। ধর্মের নামে অন্যায়ভাবে অন্যের অধিকার খর্ব করাই এদের কাজ। আবার নিজেদের সংগঠনের নাম রাখে ‘তাহাফ্ফুজে খতমে নবুয়ত’। নবীর ধর্মের সেবক হবার দাবী করে, অন্যদের আত্মঘাতি আক্রমনে প্ররোচিত করে কিন্তু নিজেদের প্রাণের আশংকা আছে জানলে এরা লেজ গুটিয়ে পালায়। যে নবীর সম্মান রক্ষার জন্য এরা আন্দোলন করছে সেই নবীর পদাঙ্ক অনুসরণে খোদা যে নিয়ামতরাজির পথ খোলা রেখেছেন এরা নিয়ামতের সেই দ্বার রুদ্ধ করে দিতে কুন্ঠা বোধ করে না। মোটকথা সকল প্রকার আধ্যাত্মিক ব্যাধিতে এরা আক্রান্ত। এরা সিদ্দিকও নয় এরা শহীদও হয়নি এবং সালেহ্ বা সৎকর্মশীলও হতে পারবে না আর নবুওতকেতো পূর্বেই অস্বীকার করে বসে আছে। খোদার নিয়ামতের দরজা তারা নিজেদের জন্য চিররুদ্ধ করে রেখেছে। সুতরাং আজ আমরা মুহাম্মদী মসীহ্র অনুসারীরা যদি নিজেদের মধ্যে একটি আধ্যাত্মিক পরিবর্তন এনে এই অনন্ত নিয়ামতের উত্তরাধিকারী হতে পারি তাহলে আমরাই সত্যিকার ঈদ উদ্যাপন করতে পারবো। এ জন্য একজন আহ্মদীর সদা সচেষ্ট থাকা বাঞ্ছনীয়। আজ যুগ মসীহ্কে মানার জন্যই আমাদেরকে কষ্ট দেয়া, হত্যা করা বা শহীদ করা হয়। আমাদের অপরাধ শুধু এটুকু যে, আমরা বলি খোদার নিয়ামতের ধারা বন্ধ হয়নি। যদি কেউ সত্যিকারেই খোদা ও রসূলের আনুগত্য করে তাদের ভালবাসায় বিলীন হয় তাহলে আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ পুরস্কার নবুওয়ত পর্যন্তলাভ করতে পারে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-কে আল্লাহ্ তা’লা জানিয়ে রেখেছিলেন যে, কষ্ট-ক্লেষের পর স্বাচ্ছন্দের দিন আসবে আর অস্বীকারকারীরা লাঞ্ছিত হবে। তাদের কোন ষড়যন্ত্র বা আঁতাত খোদার সিংহের উন্নতির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করতে পারবে না। আল্লাহ্ তা’লা আরবী ভাষায় তাঁর প্রতি ইলহাম করেছেন:
بعد العسر يسرا
{বা’দাল উসরে ইউসরা}
অর্থ: ‘এই সহজসাধ্য বা স্বাচ্ছন্দের অবস্থা তোমার জামাতের জন্য নির্ধারিত, এটি অবশ্যই আসবে।’
এটি কোন সাধারণ বিষয় নয় বরং এর পিছনে মহান এক বিজয়ের সুসংবাদ রয়েছে। বিভিন্ন সময় জামাতের নিষ্ঠাবান সদস্যরা শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছেন। দু’বছর পূর্বে ফজরের নামাযের সময় মন্ডি বাহাউদ্দীনে আটজন ধর্মপ্রাণ আহ্মদীকে শহীদ করা হয়। এবছর রমযানেও দু’জন নিষ্ঠাবান যুবক এবং একজন বর্ষিয়ান আহ্মদীকে শহীদ করে এরা আহ্মদীয়াতের অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করার অলীক স্বপ্ন দেখে। খোদার খাতিরে যারা পূর্বেই প্রাণ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত এরা কি করে তাদেরকে দমিয়ে রাখতে পারে। কখনো নয়, কখনো নয়। শত্রু আমাদের কাছ থেকে রমযান ও ঈদের আনন্দ কেঁড়ে নেয়ার ফন্দি করেছিল কিন্তু তারা জানে না তাদের এরূপ ঘৃণ্য অপকর্মের ফলে রমযানের আশিস থেকে আমরা আরো বেশি কল্যাণমন্ডিত হয়েছি। যারা নিরীহ আহ্মদীদের হত্যা করছে, সরকার বা সরকারের বিভিন্ন সংস্থা মোল্লাদের প্ররোচনায় পড়ে তাদের ধরার পরিবর্তে মহনাবী (সা:)-এর সম্মানহানীর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে নিষ্পাপ আহ্মদীদেরকে জেলে পুরছে। এটি আমাদের জন্য একান্ত কষ্টদায়ক কেননা মুহাম্মদ (সা:)-এর বংশের প্রতিও যদি কোন অপবাদ লাগানো হয় তাহলেও আমরা প্রচন্ড দু:খ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ি। হে আহ্মদী বিরোধী অজ্ঞরা! একটু বিবেক খাটাও, তোমরা কি বলছো আর কি করছো। মনে রেখো নিরীহ আহ্মদীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করার জন্য খোদা আছেন। যদি তোমরা এই অন্যায় অবিচার ও নিষ্পেষণ থেকে বিরত না হও তাহলে খোদার কঠোর হস্ত তোমাদেরকে ধ্বংস করবেন। আমাদের খোদা সর্বদা আমাদেরকে এই সুসংবাদ দিচ্ছেন যে, যেভাবে রোযার কুরবানী তোমাদের জন্য ঈদরূপী আনন্দের বার্তা নিয়ে এসেছে অনুরূপভাবে আহ্মদীদের কুরবানী মহা আনন্দের বার্তা বহন করবে।
সুতরাং আজ শান্তি ও সৌহার্দের পথ সুগম করার দায়িত্ব আহ্মদীদের। সেদিন সমাগত যখন শহীদের প্রতিটি রক্ত বিন্দু তোমাদেরকে বলবে,
‘দেখো! আমার রক্ত বৃথা গেছে কি?’ শহীদের সন্তান, বিধবা স্ত্রী, পিতা-মাতা এবং ভাই-বোন অতি আনন্দের সাথে বলবে যে, ‘দেখো! আমাদের পিতা, স্বামী, সন্তান বা ভাই যে কুরবানী করেছেন, যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা এই প্রভাতের তুলনায় বেশি উজ্জ্বল এবং বেশি জগমগ করছে। আজ আমরা সেই ঈদ দেখছি যে ঈদের জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ত্যাগ স্বীকার করে। সেই প্রভাত যখন উদিত হবে তখন হযরত মসীহ্ মওউদ (আ:)-এর সাথে কৃত খোদার এই প্রতিশ্রুতি,
العيد الاخر تنال منه فتحا عظيما
{আল্ ঈদুল আখার তানালু মিনহু ফাতহান আযীমা}
অর্থ: ‘আরো একটি ঈদ রয়েছে যা তোমার বিজয়কালে আসবে’
এ ইলহাম অত্যন্ত মহিমার সাথে পূর্ণ হবে। তখন প্রত্যেক আহ্মদী আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা এই ঈদকে স্বাগত জানাবে। প্রকৃতপক্ষ্যে এই ঈদই আহ্মদীদের চুড়ান্ত উদ্দেশ্য।’
সবশেষে হুযূর ঈদের নামাযে উপস্থিত সকল আহ্মদী এবং এমটিএ’র মাধ্যমে বিশ্বের সকল আহ্মদীকে ঈদ মোবারক জানান। হুযূর বলেন, এই ঈদ আহ্মদীয়া খিলাফতের দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথম ঈদ। আল্লাহ্ করুন সত্বর খোদা তা’লা আমাদেরকে চুড়ান্ত ঈদ উদ্যাপনের তৌফিক দিন। জামাতের সকল কর্মী, আহ্মদীয়াতের খাতিরে যারা কারাভোগ করছেন, সকল ওয়াফফে নও এবং ওয়াকফে যিন্দেগীকে আপনারা দোয়ায় স্মরণ রাখুন। আসুন আমরা সবাই মিলে দোয়া করি।
প্রাপ্ত সুত্রঃ কেন্দ্রীয় বাংলা ডেস্ক, লন্ডন, ইউকে