In the Name of Allah, The Most Gracious, Ever Merciful.
Love for All, Hatred for None.
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمـٰنِ الرَّحِيمِ
সৈয়্যদনা হযরত আমীরুল মু’মিনীন খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই:)
বাইতুল ফুতুহ্ মস্জিদ, লন্ডন, ইউকে
২০শে ডিসেম্বর, ২০০৭ইং
أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك لـه، وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم*
بسْم الله الرَّحْمَن الرَّحيم * الْحَمْدُ لله رَبِّ الْعَالَمينَ * الرَّحْمَن الرَّحيم * مَالك يَوْم الدِّين * إيَّاكَ نَعْبُدُ وَإيَّاكَ نَسْتَعينُ * اهْدنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقيمَ * صِرَاط الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْر الْمَغْضُوب عَلَيْهمْ وَلا الضَّالِّينَ (آمين)
উচ্চারণ: আশহাদু আন্ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু আম্মা বা’দু ফাউযু বিল্লাহি মিনাশ্ শাইতানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামীন আর্ রহমানির রাহীম মালিকি ইয়াওমিদ্দিন ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন ইহদিনাসসিরা তাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আনআমতা আলাইহীম গাইরিল মাগযুবে আলাইহীম ওয়ালায্ যোয়াল্লীন। (আমীন)
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ
(সূরা হাজ্জঃ ৩৮)
আমি যে আয়াত তেলাওয়াত করেছি, তাতে আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন, কখনও না আল্লাহ্ তাআলা পর্যন্ত এর মাংস পৌঁছবে? আর না রক্ত। বরং তোমাদের তাক্ওয়া তাঁর নিকট পৌঁছবে।
আজ আমরা ঈদুল আযহিয়া পালন করছি। যাকে কুরবানীর ঈদ বলা হয়। এই ঈদ যাদের সামর্থ্য রয়েছে তারা পশু কুরবানী করে। আর হাজীদের পক্ষ থেকে লক্ষ লক্ষ পশু কুরবানী করা হয়ে থাকে। আজ ও আগামী কাল বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি পশু কুরবানী করা হবে। এই ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি জবাই করাই কি ঈদের উদ্দেশ্য? এটা কি এমনই কোন কাজ যার প্রতি আল্লাহ্ খুবই খুশি হন। অথবা এটা কি ঐ কাজ অথবা কি এখানে এসে দু রাকাত নামায পড়ে নিল। আর ইচ্ছা বা অনিচ্ছা সত্ত্বেও খুতবা শুনে নিল। তারপর তাড়াহুড়া করে বাড়ি চলে যায় যেন পশু জবাই করতে পারে। অধিকাংশ দেশ যেখানে প্রকাশ্য পশু জবাইয়ের অনুমতি রয়েছে যেখানে লোকেরা নিজেরাই পশু জবাই করে। কিন্তু ইউরোপে তো এর অনুমতি নেই। আর এটা করে মনে করে আমরা খোদার সন্তুষ্টির জন্য যে কাজ করার প্রয়োজন তা করে ফেলেছি।
পাকিস্তানে আমি দেখেছি, রাবওয়াতেও দেখেছি। ঈদের নামাযের ৫/৭ মিনিটের মধ্যেই ফেরার পথে দেখি অনেক লোক ঐ অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেদের পশু জবাই করে কেটে বসে রয়েছে, সেখানে তো এখানকার মত বাধা-নিষেধ নেই। তদ্রুপ আফ্রিকার দেশগুলোতেও। সেখানে যেখানে চাও পশু জবাই কর। কোন বাধা-নিষেধ নেই। রাস্তার পাশেই করা হোক না কেন? বরং আমি দেখেছি ঈদের নামায পড়ে যত তাড়াতাড়িই আসা হোক না কেন রাস্তার পাশে বড় বড় পশু, যেমন গরু ও অন্যান্য পশু জবাই হতে দেখা যায়। অনেকে পশুর চামড়া ছাড়িয়ে বসে থাকে। এমনকি মাংসও কাটা শুরু হয়ে যায়। এটা থেকে প্রকাশ হয় এই লোকেরা যারা মাংস কাটার কাজে ব্যস্ত। যাদের মুসলমান বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে তারা মুসলমানই হয়। কেননা কুরবানীর পশুর মাংস মুসলমান ব্যতিত অন্যদের দ্বারা কাটানো হয় না। ওরা হয়তো নামায পড়ে নি। নতুবা খুতবা শুনে নি। শুধু তাদের পশু জবাইয়েরই চিন্তা থাকে। কখন যাবো, আর কখন পশু জবাই করবো আর কখন মাংস খাব। তাদের ধ্যাণ-ধারনায় কেবল মাত্র ঐ চিন্তা থাকে, কিভাবে ঐ সুন্নতের ওপর আমল করবো। রসূল (সা.) ঈদের সময় অর্থাৎ কুরবানীর ঈদের দিন সকালে পশু জবাই করে এর মাংস দিয়ে খেতেন। কিন্তু তারা এ বিষয়টি ভুলে যায় আঁ হযরত (সা.) সবচে বেশি এ ঈদের অর্থাৎ কুরবানীর ঈদের নিগূঢ় তত্ত্বকে বুঝাতেন। আর নিজের উম্মতের মাঝে এ শিক্ষা দেয়ারও চেষ্টা করেছেন।
কুরবানীর ঈদের বিষয় শুধু এতটুকুই নয় যে পশু জবাই করো। আর নামাযের পর সর্বাগ্রে শুধু এ কাজই করো। ছাগল জবাই কর আর এর মাংস খাও। এই কুরবানীর ঈদের ক্ষেত্রে কুরবানীর (আত্মত্যাগের) এক দীর্ঘ ইতিহাস জাড়িত রয়েছে। এর সূচনা হযরত ইবরাহীম (আ.) এর মাধ্যমে হয়েছে। আর এর সাথে তাঁর স্ত্রী সন্তানও শামিল ছিলেন। এতে হযরত হাজেরা ও হযরত ইসমাঈল (আ.)ও অংশগ্রহণ করেছেন। আর এর পরিপূর্ণতা আঁ হযরত (সা.) এর সত্তায় এসে লাভ করেছে। তাঁর (সা.) সাহাবাগণও তাঁর (সা.) আদর্শের অনুসরণে এর দৃষ্টান্ত জগতে স্থাপন করে গেছেন।
সুতরাং আমাদেরকে এটা দেখা উচিত, প্রতি বছর যে ঈদ আসে তাতে আমরা আমাদের আধ্যাত্মিকতার মানকে কিভাবে উন্নত করতে পারি, নিজেদের কুরবানীর মানকে কিভাবে উন্নত করতে পারি নতুবা আল্লাহ্ তাআলার কাছে আমাদের এই গরু, ছাগল ইত্যাদি জবাই করাতে কোন যায় আসে না। আল্লাহ্ তাআলা যে উদ্দেশ্যের জন্য মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সে উদ্দেশ্য পূরণকারী মানুষ তিনি দেখতে চান। নতুবা এই মাংস ইত্যাদি তো শুধুমাত্র জবাই করার একটা নিমিত্ত মাত্র। আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
আল্লাহ্ তাআলা কুরআন করীমে বলেন, لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا (সূরা হাজ্জঃ ৩৮) স্মরণ রেখ! এই কুরবানীর (পশুর) রক্ত ও মাংস কখনো আল্লাহ্ তাআলার নিকট পৌঁছে না। সুতরাং আমরা প্রতি বছর যে কুরবানী করি তাতে ঐ রূহ অন্বেষণ করা উচিত যে রূহ কুরবানীতে নিহিত থাকা উচিত। আর এর রূহ কী? এর উত্তর আল্লাহ্ তাআলা এ আয়াতে দিয়ে দিয়েছেন وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ (সূরা হাজ্জঃ ৩৮)অর্থাৎ তোমাদের হৃদয়ের তাক্ওয়া আল্লাহ্ তাআলার নিকট পৌঁছায়।
কুরবানীর এই দর্শনকে বর্ণনা করে হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) বলেন,
আল্লাহ্ তাআলা ইসলামী শরীয়তে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিধিবিধানের দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করে রেখেছেন। সুতরাং মানুষের জন্য এ নির্দেশ, সে যেন নিজের সমস্ত শক্তি ও সত্তাকে খোদার রাস্তায় উৎসর্গ করে দেয়। বাহ্যিক কুরবানী এজন্যই। এটাই কুরবানীর আসল উদ্দেশ্য।
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ
(সূরা হাজ্জঃ ৩৮)
খোদার নিকট তোমাদের কুরবানীর রক্ত মাংস পৌঁছে না। পৌঁছে তোমাদের তাক্ওয়া। সুতরাং তাঁকে এতটা ভয় কর যেন তাঁর রাস্তায় মরেই যাচ্ছো। যেভাবে তুমি নিজ হাতে পশু জবাই কর, সেভাবেই তুমি খোদার রাস্তায় জবাই হয়ে যাও। যখন বোঝা যাবে তাক্ওয়ার মান ঐ স��তর থেকে কম রয়েছে সে অসম্পূর্ণ ও দুর্বল। অনেক জায়গায় বলেন-চিরাচরিত বিধান এটাই। সবকিছু মারেফাতে কামেলা (পরিপূর্ণ তত্ত্বজ্ঞান) লাভের পর অর্জিত হয়। ভয়, ভালবাসা �� ��র মূল মারেফাতে কামেলা। আল্লাহ্ তাআলার তাক্ওয়া অবলম্বন কর। সেটাকে বুঝার চেষ্টা কর।
সুতরাং যাকে পরিপূর্ণ তত্ত্বজ্ঞান দান করা হয়েছে। এটাই তাক্ওয়া। যেন তাঁর ভয় ও ভালবাসা থাকে। আর যাকে পরিপূর্ণ ভয় ভালবাসা দেয়া হয়েছে, তাকে সব গুনা থেকে পরিত্রাণ লাভের শক্তি দান করা হয়েছে। প্রত্যেক গুনা থেকে বাঁচার শক্তি তখনই লাভ হয় যখন হৃদয়ে পরিপূর্ণ ভয় থাকে। পরিপূর্ণ ভালবাসার সৃষ্টি হয়। আর পরিত্রাণ এর মাধ্যমেই লাভ হয়। হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) বলেন,
আমরা এ পরিত্রাণের জন্য না কোন রক্তের মুখাপেক্ষী, আর না কোন ক্রুশের মুখাপেক্ষী। আর না কোন প্রায়শ্চিত্তের আমাদের প্রয়োজন। বরং আমারা কেবল মাত্র এক কুরবনীর আকাংক্ষী যা নিজের আত্মার কুরবানী। যার প্রয়োজনিয়তাকে আমাদের হৃদয় অনুভব করছে। এমন কুরবানীরই অপর শব্দে নাম হলো ইসলাম। ইসলামের অর্থ হলো জবাই হওয়ার জন্য ঘারকে সামনে পেতে দেয়া। অর্থাৎ পরিপূর্ণ সম্মতির সাথে নিজের রূহকে খোদার দরবারে পেশ করার নাম।
সুতরাং এটা হল ইসলাম। যে আদেশ আল্লাহ্ তাআলা দিয়েছেন তা পূর্ণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও। আর এজন্য সব বড় থেকে বড় কুরবানী দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও।
এদিকেই খোদা তাআলা কুরআন মজীদে ইঙ্গিত করে বলেছেন,
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ
তোমাদের কুরবানীর রক্ত খোদার নিকট পৌঁছে না। আর না মাংস পৌঁছে। কেবল ঐ কুরবানী আমার নিকট পৌঁছে যে তোমরা আমাকে ভয় কর আর আমার তাক্ওয়া অবলম্বন কর। আমার আদেশ-নিষেধের উপর আমল কর। (সূরা হাজ্জঃ ৩৮)
সুতরাং বাহ্যিক কুরবানীর ব্যবস্থা এই সঞ্জীবনী শক্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই করা হয়ে থাকে। নতুবা আমাদের পশু কুরবানী করা এটা নেকি নয়। মাংস খাওয়াটাও নেকী নয়। আর না ঐ মাংস ও রক্ত আল্লাহ্র নিকট পৌঁছে।
সুতরাং আমাদেকে বাহ্যিক কুরবানীর ক্ষেত্রে ঐ সঞ্জীবনী শক্তি সৃষ্টি করতে হবে যা করার নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ্ তাআলার পরিপূর্ণ তত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে হবে। আর এ পরিপূর্ণ তত্ত্বজ্ঞান হযরত হাজেরা (রা.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.) লাভ করেছিলেন বলেই তাঁরা কুরবানী করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। হযরত হাজের (রা.)-এর এটা খোদা তাআলার সাথে সম্পর্ক, ঈমান, ভালবাসা ও দৃঢ়বিশ্বাসই ছিল। যার কারণে তিনি হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে বলেছিলেন,
যদি এটা খোদা তাআলার ইচ্ছা হয় তাহলে আমি আমার বাচ্চাসহ কুরবানী দেয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। খোদার নির্দেশের মোকাবেলায় আমাদের প্রাণের কোন মূল্য নেই।
আর ছেলের তরবীয়তের মানদন্ড দেখুন! মা-বাপের ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত খোদার প্রতি গভীর ভালবাসা দেখে কেমন চারিত্রিক উৎকর্ষতা তাঁর হয়েছিল। এ ছেলে অনেক ছোট হওয়া সত্ত্বেও, তাক্ওয়ার ও ভালবাসার গভীর নিগূঢ় তত্ত্ব না বুঝা সত্ত্বেও-এ ঘোষণা দিয়েছেন
يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِن شَاء اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ
হে আমার পিতা তোমাকে যে বিষয়ের আদেশ দেয়া হয়েছে এর বাস্তবায়ন কর। (সুরা সাফ্ফাতঃ ১০৩)
সুতরাং এটা ছিল ঐ পিতা-মাতা ও সন্তানের কুরবানীর মানদন্ড। যাঁদের স্মৃতির স্মরণে চিরকালের জন্য এ কুরবানীর রীতিকে প্রবাহমান করেছিলেন।
এই কুরবানীকে এজন্য সর্বদার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন, কেননা হযরত ইব্রাহীম (আ.) নিজের স্ত্রী-সন্তানকে জনমানবহীন এবং খাবার পানি শূন্য এক স্থানে বিসর্জন দিয়ে এমন এক কুরবানী করেছেন যেটা ঐ ব্যক্তি ছাড়া আর কারো পক্ষে করা সম্ভব নয়। যার নিকট আল্লাহ্র ভালবাসার বিপরীতে জগতের অন্য সব কিছুর ভালবাসা তুচ্ছ। তিনি বাহ্যিকভাবে দেখেছেন, তিনি নিজ স্ত্রী ও সন্তানকে এক অনাবাদী জায়গায় ফেলে যাচ্ছেন। যেখানে তারা জীবিত থাকতে পারবে না। কয়েকদিন পর তাদের মৃত্যুটা নিশ্চিত এটা তিনি উপলব্ধি করতে পারছিলেন। এজন্য আবেগের কারণে তিনি (আ.) হযরত হাজেরা (র.)-এর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছিলেন না। শুধু মাত্র আঙ্গুল উঠিয়ে আকাশের দিকে ইঙ্গিত করছিলেন। কিন্তু হযরত হাজেরা ও ইসমাঈল (আ.)-এর হৃদয় নবীর সান্নিধ্যের কারণে কুরবানীর জন্য যেভাবে হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) বলেছেন তারা সব ক্ষেত্রে ঘার সামনে পেতে দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) এক জায়গায় বলেছেন, এ রকম কুরবানীরই অন্য শব্দের নাম হলো ইসলাম। সুতরাং ঐ বংশের এটাই পরিপূর্ণ নিষ্ঠা ও কুরবানীর দৃষ্টান্ত ছিল। এটাকে আল্লাহ্ তাআলা গ্রহণ করেছেন। আর তাঁদেরকে সম্মানের আসনে সমাসীন করেছেন। আর এ কুরবানীকে আল্লাহ্ বিনা প্রতিদানে ছেড়ে দেন নি। শুধু মা ছেলেই নিরাপদ ছিলেন না বরং কিছুদিনের মধ্যে তাদের চারপাশে বসতি গড়ে উঠে। আর পরে বালির নিচে চাপা পড়া জগতের সবচে প্রাচীন গৃহকে ইব্রাহীম (আ.)-এর মাধমে বের করেন এবং দ্বিতীয়বার এটাকে নির্মাণ করান। হযরত ইব্রাহীম (আ.) যখন দ্বিতীয়বার আসেন তখন হযরত ইসমাঈল (আ.)ও এর নির্মাণের কাজ করছিলেন তখন কাজের সাথে সাথে দোয়াও করেছিলেন। খোদা তাআলা এটাকে গ্রহণ করো। এ কুরবানীকে গ্রহণ করো। আর এ দোয়াও করেছিলেন,
এখন এ শহরকে আবাদ করো। এমনভাবে এ শহরকে আবাদ কর যেন এটা শান্তিকামী নিরাপদ শহর হয়। কোন ধরনের রক্তপাত যেন এতে না হয়। আর এখানে বসবাসকারীদের জন্য যেন সব সময় তোমার পক্ষ থেকে সব ধরণের ফলফলাদির রিয্ক পৌঁছতে থাকে। আর সবচে অগ্রগণ্য হয়ে এ দোয়া করছিলেন আমাদেরকে সর্বদা নেকীর ওপর প্রতিষ্ঠিত রেখ। আর তোমার সমীপে কুরবানী পেশ কারীতে পরিণত কর। আর শুধু যেন এটা আমাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। এটা আমাদের সন্তানদের মাঝেও যেন প্রতি স্থাপিত হয়।
কুরআন করীমে এসেছে হযরত ইব্রাহীম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) এ দোয়া করেছিলেন,
رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
হে আমাদের প্রভু প্রতিপালক! আমাদেরকে তোমার দু’জন নিষ্ঠাবান বান্দা বানাও। আর আমাদের বংশধরদের মাঝে তোমার নিষ্ঠাবান উম্মত সৃষ্টি করো। আর আমাদেরকে তোমার ইবাদত ও কুরবানীর পদ্ধতি শিখাও। আর আমাদের ওপর তুমি সদয় দৃষ্টিপাত করো। নিশ্চয়ই আমি সবচে বেশি সদয় দৃষ্টিপাতকারী। আর বার বার দয়াকারী। (সূরা বাকারাঃ ১২৯)
সুতরাং এ দোয়া ছিল। আমাদেরকে সর্বদা এমন রাস্তায় পরিচালিত করো যা তোমার সন্তুষ্টির রাস্তা। যা পুত্র নির্জনে থেকে আর পিতা সন্তান ও স্ত্রীকে রেখে কুরবানীর এমন এক দৃষ্টান্ত রেখেছেন যেটা আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কুরআনে এভাবে উল্লেখ করেছেন,
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَات فَأَتَمَّهُنَّ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَاماً
যখন তাঁর প্রভু ইব্রাহীমকে পরীক্ষা নিলেন। তখন সে (ইব্রাহীম) সেগুলো পূর্ণ করলেন। তখন তিনি বললেন, নিশ্চয় আমি তোমাকে লোকদের জন্য ইমাম বানাবো। (সূরা বাকারাঃ ১২৫)
তখনই তিনি নিবেদন করেছেন, وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا(সূরা বাকারাঃ ১২৯) তুমি আমাদেরকে ইবাদত ও কুরবানীর পদ্ধতি শিখাও। আর আমাদের প্রতি তওবা কবুল করে সদয় দৃষ্টিপাত করো। আর কখনও যেন আমাদের দ্বারা এমন কাজ না হয় যার কারণে আমাদের কুরবানী নষ্ট হয়ে যায়। অবস্থার প্রেক্ষিতে তুমি সবচে ভাল জানো। কোন সময় কোন কুরবানী করা প্রয়োজন। সুতরাং তোমার পথ প্রদর্শন ��� তোমার সন্তুষ্টিই মূল বিষয়। এটা থেকে কখনও আমাদেরকে বাহিরে নিক্ষেপ করো না। এটা ছি তাদের দোয়া।
আবার আরেক দোয়া তিনি যাচনা করেছেন যাতে কিয়ামত পর্যন্ত আগত মানব ���্��জন্মের জন্য নিজের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন এক নবীর আবির্ভাবের জন্য দোয়া করেছেন যিনি হযরত ইব্রাহীম ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর চেয়ে বড় কুরবানী সম্পাদনের দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী হবেন। আর এটা এ দোয়া ছিল
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنتَ العَزِيزُ الحَكِيمُ
হে আমাদের প্রভু প্রতিপালক! তুমি আমাদের মধ্যে এমন এক রসূলকে প্রেরণ কর যে তোমার নিকট তোমার আয়াত পড়ে শুনাবে। যে তোমাদেরকে কিতাবের শিক্ষা দিবে। হিকমত শিখাবে আর তাদের পুতপবিত্র করবে। নিশ্চিত তুমি পরম ক্ষমাশালী ও পরম প্রজ্ঞাময়। (সূরা বাকারাঃ ১৩০)
আল্লাহ্ তাআলা এ পিতাপুত্রের দোয়া কবুল করে আঁ হযরত (সা.)-কে বলেন,
তুমি ঘোষণা করে দাও। আমি ঐ রসূল যাঁর দোয়া হযরত ইব্রাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.) করেছিলেন।
আর পুনরায় আল্লাহ্ তাআলা আঁ হযরত (সা.)-কে বলেন, হযরত ইব্রাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.) এ দোয়া করেছিলেন
وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا
(সূরা বাকারাঃ ১২৯)
কিন্তু হে মুহাম্মদ (সা.)! তুমি জগতে ঘোষণা দাও আমার মাঝে সমস্ত ইবাদত ও কুরবানীর মানদন্ড পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। আমি ঐ পরিপূর্ণ ও পূর্ণমানব এবং রসূল যার মধ্যে মানবীয় সব গুণাবলীর চরম উৎকর্ষতা সাধিত হয়েছে। এখন নতুন কোন রাস্তা শিখার প্রয়োজন নেই। আমি খোদার সমীপে এমনভাবে বিলীন যে আমার নিজের বলতে কিছুই নেই। সব কিছু খোদার। আল্লাহ্ তাআলা আঁ হযরত (সা.) এর মাধ্যমে এ ঘোষণার দ্বারা স্বীকৃতি দিয়েছেন,
قُلْ إِنَّ صَلاَتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
(সূরা আল্- আন্আমঃ ১৬৩)
হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,
“তুমি বলে দাও আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার সমস্ত চেষ্টা প্রচেষ্টা ও সাধনা আল্লাহ্র জন্য। আমার জীবিত থাকা, মৃত্যুবরণ করা সবই আল্লাহ্র জন্য। তিনিই একমাত্র খোদা যিনি সমস্ত বিশ্ব জগতের প্রভু-প্রতিপালক। তাঁর কোন শরীক নেই। আর আমাকে ঐ বিষয়ের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর আমি সর্ব প্রথম আত্মসমর্পণকারী। অর্থাৎ জগতের সূচনা থেকে এর পরিসমাপ্তি পর্যন্ত আমার মত আর কোন পূর্ণমানব নেই। এমন উচ্চ মর্যাদার অধিকারী আর কেই নেই। এমন ফানাফিল্লাহ্ আর কেউ নেই”।
হযরত ইব্রাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এ দোয়া করেছিলেন,
رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ
হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে দু’জন আত্মসমর্পনকারী বানাও। (সূরা বাকারাঃ ১২৯)
আরও দোয়া করেছেন,
رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْهُمْ
হে আমাদের প্রভু! তুমি তাদের মাঝে তাদের মধ্য থেকে রসূল পাঠাও। (সূরা বাকারাঃ ১৩০)
সুতরাং আল্লাহ্ তাআলা এ দোয়া কবুল করে আঁ হযরত (সা.) কে প্রেরণ করেছেন। আর তাঁকে প্রেরণের পর এ ঘোষণা দিয়েছেন-আমি তোমার কুরবানীকে ও তোমার দোয়াকে গ্রহণ করেছি। আর এ মহান রসূল এ ঘোষণাও দিয়েছে শুধু তাঁর ইবাদত আর কুরবানীই ঐ মর্যাদা লাভ করেনি-বরং এটা পূর্বের জন্য, বর্তমানের জন্য এবং ভবিষ্যতের জন্য এমন এক আদর্শ যার গন্ডির বাহিরের কোন কুরবানীকে কুরবানী বলা হয় না, কোন ইবাদতকে ইবাদত বলা হয় না। আর পরে এ ঘোষণা দিয়েছেন আমি সর্ব প্রথম মুসলমান। আমি সর্বপ্রথম নিষ্ঠাবান। আর এ মর্যাদা আমার পূর্বে কেউ লাভ করেনি, আমার যুগেও লাভ করেনি আর আমার পরেও কেউ লাভ করবে না। আর এটাই তাঁর (সা.) পরিপূর্ণ মানব ও খাতামুল আম্বিয়া হওয়ার নিগূঢ় তাৎপর্য। এতে সমগ্র জগতের সমস্ত মানুষ ও সমস্ত নবী অন্তর্ভুক্ত। কেউ-ই এই মর্যাদায় পৌঁছতে পারবে না।
এ মর্যাদা যা তাঁকে আল্লাহ্ তাআলা দান করেছিলেন এটা শুধু তাঁর নিজের সত্তার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং উম্মতকেও নির্দেশ দিয়েছিলেন এ মহান রসূল তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। এ জন্য এ রসূলের আনুগত্যের দাবী করলে ঐ পথে চল যাতে চলার জন্য তিনি দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) বলেন,
রসূল (সা.) কে বলা হয়েছে, হে নবী! যারা তোমার অনুসারী তাদেরকে বলে দাও-আমার নামায, আমার কুরবানী আল্লাহ্র জন্য। আমার জীবিত থাকা, আমার মৃত্যুবরণ করা সবই আল্লাহ্র জন্য। যারা আমার অনুসারী হতে চায় তারা যেন আমার পুরোপুরি অনুসরণ করে।
পরে দেখুন, সাহাবীরা তাঁর অনুসরণ করে কিরূপ দৃষ্টান্ত জগতে উপস্থাপন করে গেছেন। তারা এমন কুরবানীর দৃষ্টান্ত আরবের স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক সমাজে রেখেছেন যেখানে নিজের ইচ্ছা ও আকাংক্ষার নাম নিশানাকে অবশিষ্ট রাখেনি। নিজেদেরকে নিষ্ঠাবান সাব্যস্ত করে নিজ প্রভুর সমীপে সব কুরবানী পেশ করেছেন। যেটা এক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ইবাদতের এমন মানদন্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন যার দৃষ্টান্ত না আগে পাওয়া যেত, না পরে পাওয়া যাবে। যে দৃষ্টান্ত আঁ হযরত (সা.) সাহাবাগণ অর্থাৎ পুরুষ, মহিলা, শিশু নির্বিশেষে সবাই রেখে গেছেন। এটা আমাদের জন্য একটা উপমা। তারা তাদের রাতগুলোকে ইবাদতের মাধ্যমে জীবিত করেছেন। কুরবানীর প্রয়োজন হলে জীবন দিয়েছেন। ইবাদত করা শুরু করেছেন তো সারারাত ইবাদত করেছেন। আর এমন এমন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন যাতে নিজ ঘুম দূর হয়ে যায়। মোট কথা তারা কুরবানীর উন্নত থেকে উন্নততর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। যেগুলো আমাদের জন্য আদর্শ।
জীবন কুরবানীর একটা উদাহরণ দিচ্ছি,
হযরত যায়েদ বিন ওয়ালীদ এর ঘটনা। যখন তার মৃত্যুর সময় আসলো সে কাঁদতে লাগলো। কাঁদতে কাঁদতে তার অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। কেউ জিজ্ঞাস করলো-মৃত্যুকে ভয় করছো? অথবা কি অন্য কোন দুশ্চিন্তা? আপনি ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামের অনেক সেবা করেছেন। আপনার ভয় কিসের? আল্লাহ্ তাআলা আপনাকে বিনা প্রতিদানে ছেড়ে দিবেন না? তিনি বল্লেন-মৃত্যুর ভয় নেই। এজন্য আমি কাঁদছি না। আমি ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামের জন্য নিজের প্রাণ বিসর্জন দেয়ার জন্য ভয়ানক থেকে ভয়ানকতর জায়গায় শত্রুর মোকাবেলা করেছি, তুমি পা থেকে কাপড় উঠিয়ে দেখ, আমার বাহু থেকে কাপড় উঠিয়ে দেখ, আমার পিঠ থেকে কাপড় উঠিয়ে দেখ, আমার বুক থেকে কাপড় উঠিয়ে দেখ, আমার সমস্ত শরীরকে দেখে নাও। কোন এমন জায়গা নেই যেখানে আঘাতের চিহ্ন নেই। আমি তো আল্লাহ্র রাস্তায়, আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য প্রাণ কুরবানী দেবার আশায় ভয়ানক থেকে ভয়ানক জায়গায় গিয়ে যুদ্ধ করেছি। আজ এজন্য আমি কাঁদছি। বিছানায় আমার মৃত্যু হচ্ছে। আল্লাহ্ করুন আমার শহীদের মার্যাদা অর্জিত হয়নি এজন্য যেন তিনি আমার ওপর অসন্তুষ্ট না হন।
এটা ছিল ঐ মনি মানিক্য ও হীরা যা এই মহান নবী (সা.) নিজের পবিত্রকরণ শক্তি দ্বারা নিজের অনুসারীদের মাঝে সৃষ্টি করেছিলেন। যারা সারা জীবন লাগাতার কুরবানী দিয়ে গেছেন। যাদের প্রতি খোদা তাআলা সন্তুষ্ট ছিলেন। তাদের প্রতি আল্লাহ্ তাআলাও সন্তুষ্ট। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ তাআলা রাযিয়াল্লাহু আনহুম শব্দ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তারপরও তাদের এ ভয় কাজ করছে হয়তো আমাদের কুরবানী কবুল হয়নি।
হযরত ইব্রাহীম (আ.) নিজের বংশধরদের মাঝে সর্বদা যেন নিষ্ঠাবান উম্মত সৃষ্টি হয় এজন্য দোয়া করেছিলেন। আর এ জন্য আল্লাহ্ তাআলা আঁ হযরত (সা.)-কে পাঠিয়ে, তাঁকে (সা.) খাতামুল আম্বিয়া বানিয়ে, তাঁর শরীয়তকে পরিপূর্ণতা দান করে কিয়ামত কাল পর্যন্ত জারি রাখার ব্যবস্থা করেছেন। এজন্য ��ৃতকে জীবিত করার দৃষ্টান্ত, প্রকৃত কুরবানী করার দৃষ্টান্ত আঁ হযরত (সা.)-কে মান্যকারীদের মধ্যেই বিদ্যমান থাকার কথা ছিল। যেভাবে আমি আমার খুতবায় বর্ণনা করেছি-হযরত ই���্র��হীম (আ.)-কে যেভাবে মৃত জীবিত করার যে দৃশ্য দেখানো হয়েছে-অর্থাৎ চতুর্থ পাখিকে পোষ মানানোর যে ঘটনা দেখানো হয়েছে এটা আঁ হযরত (সা.)-এর গোলামে সাদেক ও মসীহ্র মাধ্যমে হওয়ার ঘটনাকে দেখানো হয়েছে। কেননা তিনি হচ্ছেন মসীহ্ ও মাহ্দীই যিনি তাঁর নেতা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রকৃত প্রেমিক ও অনুসরণকারী। যিনি তার নেতার আদর্শের ওপর চলে নিজের ইবাদত, নিজের কুরবানী, নিজের জীবন মৃত্যু সবই খোদার জন্য একনিষ্ঠ করে দিয়েছেন। আর নিজের জামাআতের মাঝে এ আদর্শ সৃষ্টি করেছেন। আর এজন্য অনবরত চেষ্টা করে গেছেন।
সুতরাং আজ আমাদের কুরবানীর ঈদ তখনই প্রকৃত ঈদ হবে যখন আমরা কেবল নিজেদের কুরবানীর পশু আর ঈদের আনন্দের দিকে দৃষ্টি দেব না। বরং নিজের আত্মাকে কুরবানী করে, খোদার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টাকারী হবো। খোদা তাআলার বিধানাবলীর ওপর পুরোপুরি আমলকারী হবো। নিজের কুরবানীর মানকে বৃদ্ধি করতে থাকবো। ঐ কুরবানীকে জীবিত রাখবো যা এ যুগে হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-এর মান্যকারীরা করেছেন। তারা নিজেদের জীবনের নাযরানা উপস্থাপন করে গেছেন। কিন্তু নিজের ঈমানের ওপর কোন আচ লাগতে দেননি।
সুতরাং আজ আমরা যেখানে ঈদের খুশি আল্লাহ্ তাআলার আনুগত্যেই পালন করছি। সেখানে ঐ শহীদদেরকে ও তাদের সন্তানদেরকে দোয়ায় স্মরণ রাখা উচিত। যারা আহ্মদীয়াত অথবা প্রকৃত ইসলামের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তারা কুরবানীর বিষয়কে বুঝেছেন। আর এর ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত হয়েছেন। আল্লাহ্ তাআলা তাদের সন্তানদের প্রতি করুণা করুন। অনুগ্রহরাজী বর্ষণ করুন। তাদের দীন ও দুনিয়া দুটিই কল্যাণমন্ডিত করুন।
আমাদেরকে সর্বদা আমাদের ঐ অঙ্গীকারকে স্মরণ রাখতে হবে যে আমরা আমাদের জান, মাল, সম্মান সব কিছু কুরবানীর জন্য প্রস্তুত থাকবো। এজন্য আমাদেরকে সর্বদা প্রস্তুত থাকা উচিত।
আজকাল ইন্দোনেশীয়ার এক জায়গায় কঠিন মোখালেফাত হচ্ছে। আমাদের কয়েকটি মসজিদ ভাঙ্গা হয়েছে। ক্ষতি করা হয়েছে। দু’দিন পূর্বে দুইটি মসজিদের ক্ষতি করা হয়েছে। পুলিশ আমাদের কিছু মসজিদ সিল করে দিয়েছে। এ ছাড়া আহ্মদীদের বাড়িঘরে আক্রমণ করা হয়েছে। কয়েক আহ্মদীকে আহত করা হয়েছে। গতদিনও একজনকে আহত করা হয়েছে। তাদের জন্যও দোয়া করুন।
এই দূর দূরান্তের লোকেরাও হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-কে মান্য করেছেন। তাঁর মসীহ্ ও মাহ্দীর দাবিকে গ্রহণ করছেন। এর ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। ঈমানকে শক্তিশালী রেখেছেন। নিজের ঈমানের আত্মীয়তা, তার ও লোভ লালসাকে প্রধান্য দেননি। সেখানে অধিকাংশই গরীব লোক। কষ্টে দিনাতিপাত করেন। কিন্তু আল্লাহ্র ফযলে ঈমানে এত অগ্রসর ও শক্তিশালী যে দৈহিক ক্ষতি ও মৃত্যুকে বরণ করার জন্য তারা প্রস্তুত। কিন্তু আধ্যাত্মিক ক্ষতি ও মৃত্যুকে কিছুতেই তারা গ্রহণ করছেন না। সুতরাং এটাই মৃতকে জীবিত করা। যা আঁ হযরত (সা.)-এর প্রকৃত প্রেমিক হযরত ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর মাধ্যমে আল্লাহ্ তাআলা এ যুগে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ আদর্শকে প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দেয়াও প্রয়োজন হয়। আর সারা দুনিয়াতে আহ্মদীয়াত এর জন্য প্রস্তুত। আর এটাই মৃতকে জীবিত করার জলজ্যান্ত প্রমাণ। একই উদ্দেশ্যে-আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য পাকিস্তানী আহ্মদীরা কুরবানী দিচ্ছে। ইন্দোনেশীয়ান আহ্মদীরা কুরবানী দিচ্ছে, আর বাংলাদেশী আহ্মদীরা কুরবানী দিচ্ছে, শ্রীলংকার আহ্মদীরা কুরবানী দিচ্ছে। ভারতের আহ্মদীরা কুরবানী দিচ্ছে, বরং আজকাল তো ইউরোপের কিছু দেশেও আহ্মদীদের অবস্থা খারাপ করা হচ্ছে। সুতরাং এ সমস্ত অবস্থাকে সামনে রেখে আমাদের মাঝে সর্বদা ঐ আদর্শকে উজ্জীবিত রাখতে হবে-আমরা পরিপূর্ণ আনুগত্যের সাথে আল্লাহ্ তাআলার পূর্ণ নিষ্ঠাবান বান্দা হওয়ার চেষ্টা করবো। আল্লাহ্ তাআলা পূর্ণ নিষ্ঠাবান হওয়ার তৌফিক দান করুন। তাঁর একনিষ্ঠ প্রেম ও ভালবাসা দান করে আমাদের হৃদয়কে আলোকিত করুন। সর্বদা আমাদের থেকে সব ধরণের অন্ধকার দূর করে থাকুক। তাঁর নূর সবর্দা আমাদের ওপর প্রকাশিত হতে থাকুক। যাতে আমরা কুরবানীর আসল প্রেরণাকে বুঝতে সক্ষম হই।
এখন ইনশাআল্লাহ্ তাআলা খুতবার পর দোয়া হবে। দোয়াতে শহীদদেরকে স্মরণ রাখবেন। যারা জামাআতের জন্য কুরবানী দিয়েছেন, তাদের সন্তানদেরকেও স্মরণ রাখবেন। আসীরান যারা আহ্মদীয়াতের জন্য যারা কোন না কোন ভাবে গ্রেফতার হয়েছেন তাদেরকেও স্মরণ রাখবেন। যারা আহ্মদীয়াতের সংবাদ পৌঁছানোর কাজে সাহায্য করে যাচ্ছেন। দাওয়াত ইলাল্লাহ্র কাজে রত তাদেরকেও স্মরণ রাখবেন। যা নিজেদের সময় আল্লাহ্র দীনের জন্য বয় করে যাচ্ছেন, মারী কুরবানীকারীদেরকেও দোয়ায় স্মরণ রাখবেন। সমস্ত আহ্মদী যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রয়েছেন তাদের সবাইকে স্মরণ রাখবেন। আল্লাহ্ তাআলা তাদের সবাইকে নিজ রহমতের চাদরে আবৃত রাখুন। মুসলমান দেশসমূহের যে অবস্থা তারা একে অন্যকে মারছে, হত্যা করছে। তাদের জন্যও দোয়া করুন। আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকে শুভ বুদ্ধি দিন। তারা প্রকৃত ইসলামকে বুঝতে সক্ষম হোক। পাকিস্তানের অবস্থা, আরব দেশের অবস্থা, ইউরোপের অবস্থা, আফগানিস্তানের অবস্থা, ফিলিস্তিনের অবস্থা খুবই খারাপ। তাদের জন্য দোয়া করুন-আল্লাহ্ তাদের অবস্থা ভাল করে দিন। তাদেরকে প্রকৃত ইসলামী আদর্শে গড়ে উঠার তৌফিক দিন। মসীহ্ ও মাহ্দীকে মান্যকারী বানান। এভাবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের জন্যও দোয়া করুন। দুনিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে আঁ হযরত (সা.)-এর সত্তার সাথে। আর তাঁর সত্যিকার প্রেমিকের বয়আতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাঝে। আল্লাহ্ তাআলা তাদের সবাইকে এ তৌফিক দিন যেন তারা এ নিগূঢ় তথ্য বুঝতে সক্ষম হয়। এখন দোয়া করবো। কিন্তু দোয়ার পূর্বে আমি আপনাদেরকে ঈদ মোবারক জানাচ্ছি। সবার জন্য আল্লাহ্ তাআলা সব দিক থেকে ঈদকে মোবারকমন্ডিত করুন। আর পৃথিবীতে বসবাসকারী সব আহ্মদীকে ঈদ মোবারক। পাকিস্তানী, ইন্দোনেশীয়ান, শ্রীলংকান ও বাংলাদেশী, ভারতী, আফ্রিকান ও ইউরোপে বসবাসকারী সব আহ্মদীর জন্য ঈদ মোবারক। ঈদ সবার জন্য অফুরন্ত রহমত ও কল্যাণের কারণ হোক।
ভিডিও থেকে শ্রুত: মাওলানা মোহাম্মদ নূরুল আমীন, মুরব্বী সিলসিলাহ্
প্রাপ্ত সুত্রঃ পাক্ষিক আহ্মদী - সংখ্যাঃ ৩০শে নভেম্বর, ২০০৮ইং